ঢাকা, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ || ১ পৌষ ১৪২৬
শিরোনাম: ■ ১০৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ ■ কেরানীগঞ্জে আগুনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ ■ রোববার সকালে বায়ু দূষণের শীর্ষে ঢাকা ■ উত্তাল পশ্চিমবঙ্গে বাস-ট্রেনে আগুন ■ দুই মন্ত্রীর ভারত সফর বাতিল নিয়ে যা বলছেন এইচটি ইমাম ■ কাশ্মীরে পাক বাহিনীর গুলিতে ২ ভারতীয় সেনা নিহত ■ পাবনায় সড়ক দূর্ঘটনায় জামাই-শ্বশুড় নিহত, আহত ২ ■ সু চিকে ‘সাধু’ তৈরির নেপথ্যে পশ্চিমা বিশ্ব ■ এনআরসি-সিএবি রুখতে গণআন্দোলনের ডাক ■ রাজ্যে রাজ্যে বিক্ষোভে উত্তাল ভারত ■ হাসছে টোরি, ভাঙছে লেবার পার্টি ■ বিক্ষোভে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ, রেলস্টেশনে আগুন
রানুর গল্প
পান্না চৌধুরী
Published : Friday, 26 July, 2019 at 10:38 AM

রানুর গল্প

রানুর গল্প

আমি রানু। আমার পরিবারে রানু নামেই পরিচিত। শশুর বাড়ীতে বাবুর মা হওয়ার আগে সিরাজের বউ।নিজের নামটা হারিয়ে গিয়েছিলো।

পনেরো বছর বয়সে আমার বিয়ে হল একজন সাধারন সৈনিকের সাথে।বছরে তিনি দুমাসের ছুটিতে আসতেন। এই দুইমাস আমার কাছে মনে হত বেহেস্তে আছি।আর বাকি দিন, মাসগুলি কেমন কাটতো? গতানুগতিক! সংসার বাচ্চা সামলে দিন কাটলেও রাতটা কোনরকমে কেটে যেতো। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে গেলে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতো।বাবুর বাবা চিঠি লিখতো আমিও উত্তর দিতাম। তখন তো আর এখনকার মতো মোবাইল ছিলো না।

একে একে আমি তিন বাচ্চার মা হলাম। প্রথমে বাবু এরপর আরও দুই মেয়ে। সংসার করার ঠিক ষোল বছরের মাথায় হুট করে বাবুর বাবা মরে গেলো। আমি পরে গেলাম অথৈ সমুদ্রে। সামান্য কিছু জমিজমা আর পেনশনের টাকা। এটা দিয়ে কোন রকমে সংসারটাকে টেনে নিচ্ছিলাম। ছেলে একদিন বায়না ধরলো ইতালী যাবে।যে সামান্য জমিটুকু ছিলো তা বিক্রি করে ছেলে ইতালী গেল। প্রথমে কয়েকমাস ছেলের কষ্ট হলেও পরে ইতালীতে আস্তে আস্তে মানিয়ে নেয়। চাকরি পেয়ে সংসারে টাকা পাঠানো শুরু করলে একটু স্বচ্ছলতা আসলো। কত স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম!

কিছু মানুষ জন্মায় পোড়া কপাল নিয়ে আমি হলাম তাদের একজন!!একদিন গভীর রাতে ইতালী থেকে ফোন গেলো আমার বাবু রোড এক্সিডেন্টে হাসপাতালে আছে। আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিলো অজানা আশংকায়।আল্লাহকে কত ডেকেছি! শুধু ছেলের জীবনটা ভিক্ষা চেয়েছি। কিন্তু যাকে নিয়ে যাওয়ার তাকেতো তিনি নিয়ে যাবেনই।দুইদিন পর ছেলের মৃত্যু সংবাদ পেলাম!! আমার পৃথিবীটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল! প্রচন্ড কষ্টে মনে হয়েছিলো - আমি কি মৃত্যুগুলি দেখার জন্যই বেঁচে আছি!!

কয়েকদিন পর ছেলের বন্ধু রাজু ফোন দিলো - আমাকে ইতালী যেতে হবে। ঐ দেশের আইন অনুযায়ী রোড এক্সিডেন্টে কেউ মারা গেলে ক্ষতিপুরণ বাবত মোটা অংকের টাকা পায়। একমাত্র অভিবাবক আমি। তাই আমাকেই সেখানে যেতে হবে। আমি চোখে মুখে অন্ধকার দেখলাম। কিভাবে কি করতে হবে কিছুই জানি না। ঐ রাজুই আমার যাওয়ার সব ব্যাবস্হা করলো। আমরা একই জেলার লোক। কয়েক মাসের মধ্যেই আমি ইতালী চলে আসলাম। শুরু হল আমার নতুন জীবন। নতুন স্বপ্ন দেখলাম একটু স্বচ্ছলতার।

এখানে এসে আমি রাজুর বাসাতেই উঠলাম। রাজু আমার ছেলের থেকে দুই /এক বছরের বড় হবে। দেশে বিয়ে করে বউ রেখে এসেছে। আমরা একটা বাসায় দুজনে থাকি। টাকা পয়সা উঠানোর যত ঝামেলা আছে সব সেই সামলাচ্ছে। আমি যেহেতু ভাষা জানি না তাই যেখানে সাইন করা দরকার শুধু তাই করছি। আমার মনটা সব সময়ই ছেলেটার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিল।তবে ছেলেটার চোখের ভাষা কেমন যেনো ছিলো!! সে চোখের ভাষা শুধু নারীরাই পড়তে পারে।

একরাতে আমি ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ শরীরটা কেমন ভার ভার লাগছিলো! নড়তে পারছিলাম না।এরপর আমি সম্বিত ফিরে পেলাম।চট করেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো। কারও স্পর্শ টের পেলাম।বহু বছর পর! সেই স্পর্শে আমার শরীর জেগে উঠলো! আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম আমি বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি!

সেই থেকেই শুরু হল। তার প্রতি কি তীব্র এক আকর্ষণ বোধ করতাম। ভুলে গিয়েছিলাম আমি একজন পঁয়ত্রিশ উর্ধো বিধবা সাধারন নারী, আমি একজন মা। সমাজ, সংসার কারও কোন কিছুর কথাই আমার মনে হয় নি। আমি রাজুর প্রেমেই পরে গেলাম!
রাজু আমার প্রেমে পরেছে কিনা তা জানি না।

একসময় একসাথে আমার ছেলের এক্সিডেন্টের অনেকগুলি টাকা পেলাম। আমি দেশ থেকে ভেবে এসেছি টাকাগুলি পেলে দেশে ফিরে যাবো। এই টাকা দিয়ে দেশে অনেক আরামে থাকা যাবে। মেয়েদের ভালো বিয়ে দিতে পারবো। কিন্তু রাজু আমাকে বোঝালো টাকাগুলি এখানে বিজনেসে খাটালে বেশি লাভবান হওয়া যাবে। আমি একদিকে আরও বেশি টাকার লোভ আরেকদিকে রাজুর সঙ্গ। এই দুই কারনে শেষ পর্যন্ত এখানেই থেকে গেলাম।

শুরু করলাম বিজনেস! পুরো ইনভেস্ট আমার। আবার পুরো শ্রমও দিচ্ছি আর লাভের অংশ সমান সমান!!কারন সে বুদ্ধি খাটাচ্ছ, মেনে নিয়েছি। সেতো আমার শুধু বিজনেস পার্টনার না। আমি যে তাকে খুব ভালোবাসি। আমার সমস্ত স্বত্তা তাকে দিয়ে বসে আছি।

রাজু বছরে একবার দেশে যায়। একমাস থেকে আসে।আমার তখন সবচেয়ে খারাপ সময় কাটে। কিছুটা হিংসা হয় না এটা বলবো না।অনেক রাগও হয়। আমি তখন একদম একা হয়ে যাই। এখানকার বাঙ্গালী কমিউনিটি আমাদের সাথে মিশে না।কেউ কথা বলে না।দেখলে সবাই এড়িয়ে যায় আড়ালে হাসাহাসি করে। আমাদেরকে ঘৃনা করে। আমি জানি সুযোগ পেলে তারাও রাজু হবে!! বেশির ভাগই তো সুযোগের অভাবে সৎ মানুষ।

আর আমার পরিবার? তারা সবাই আমাকে শুধুই ঘৃনা করে। আত্মীয়স্বজনদের সহায়তায় দুই মেয়েকে যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিলাম। তাদের কাছে আমি এখন শুধুই টাকার মেশিন। তারা কেউই চায় না আমি এখন দেশে ফিরে যাই! তারা আমার জন্য সমাজে মুখ দেখাতে পারছে না।

শুনেছি রাজুর বাড়িতে বিরাট বিল্ডিং উঠেছে। তার আত্মীয়রা তার পরিবার কেউ হয়তো তাকে ঘৃনাও করে না। তার বউও হয়তো তাকে খুব ভালোবাসে। রাজুও বউকে ভালোবাসে। একদিন রাজুর কাছে তার বউয়ের কথা জানতে চেয়েছিলাম। সে চোখ গরম করে একটা গালি( খা**) দিল বলল- কখনও আমার বউয়ের কথা জানতে চাইবি না। বুঝলাম শুধু শরীরের প্রয়োজন আর টাকার লোভে সঙ্গী হিসাবেই আমাকে বেছে নিয়েছে।

ইদানিং আমার যে বয়স হচ্ছে তা খুব টের পাচ্ছি। কোন কালেই আমি তেমন সুন্দরী ছিলাম না এখন আয়নায় যখন নিজেকে দেখি নিজেই আঁতকে উঠি। গাল ভেঙ্গে যাচ্ছে, চোখের নীচে কালি। শরীরের সেই চাহিদাও আর আগের মতো নেই। রাজু ও আর আগের মতো নেই। কেমন দুরে দুরে থাকে। ভালোবাসা না থাকলে মোহ দিয়ে আর কয়দিন।

আমি জানি এই প্রেমের কারনেই ইহকাল, পরকাল দুটোই হারিয়েছি। সমাজ সংসারে আজ আমি ঘৃনিত। সবসময় গল্প উপন্যাসে দেখেছি প্রেমের জয়জয়কার। কিন্তু বাস্তবে সব প্রেমের জয় হয় না। নৈতিকতা আর অনৈতিকতার প্রশ্নটা ঠিকই সামনে চলে আসে! যতদিন বেঁচে থাকবো সামনের দিনগুলি নিয়েই আমি আতঙ্কিত থাকি। আমার কাছে টাকা থাকবে, সাথে থাকবে মানুষের ঘৃনা আর নিঃসঙ্গতা।

মাঝে মাঝে ভাবি আমি তো কখনওই অন্যকোন পুরুষের দিকে ভুলেও তাকাই নি। কাউকে কাছে পাবার কথা কখনও ভাবি নি তাহলে আজকে কেন আমার চেয়ে বয়সে ছোট একজনের প্রেমে পরে গেলাম? কেন এমন ঘৃনিত অবস্হানে চলে গেলাম? কেন আমার ছেলেটা মরে গেল? কেনই বা আমি ইতালীতে চলে আসলাম? এটাই কি নিয়তি!

দেশসংবাদ/জেএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  রানু   পরিবার   শশুর  



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. আবদুস সবুর মিঞা (অব.)
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft