ঢাকা, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ || ৪ ভাদ্র ১৪২৬
শিরোনাম: ■ অবশেষে জিব্রাল্টার ছাড়ল সেই ইরানি ট্যাংকার ■ ২০২৩ সালের মধ্যে সব স্কুলে দুপুরের খাবার ■ সেনা সদস্যকে গুলি করে হত্যা ■ ডেঙ্গু দমন নিয়ে অসন্তোষ হাইকোর্টের ■ ঢাকা মেডিকেলে দু'পক্ষের ব্যাপক সংঘর্ষ, আহত ২০ ■ ফিলিস্তিনে ইসরাইলের রকেট হামলা ■ ঘুষ প্রদানকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে ■ কাশ্মীরিদের ওপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে ■ ব্যারিস্টার মওদুদের জন্য দেশটা পিছিয়ে গেছে ■ এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২২৪ ■ শিগগিরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু ■  বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৭
শ্যামা
মোস্তফা আনোয়ার
Published : Sunday, 28 July, 2019 at 10:35 AM

শ্যামা
মোস্তফা আনোয়ার
আমাদের সমাজে এক সময় মেয়েদের জন্ম নেয়াটা এক প্রকার অভিশাপ হিসেবে ভাবা হত। আর মেয়ে যদি দেখতে অল্প একটু অসুন্দর হত, তবে সেই মেয়েকে তো তার ঘরের লোকেরাও প্রায় সময় ঘৃণা করত।

তবে শ্যামার ভাগ্যটা এতটা খারাপ ছিল না। শ্যামা, তার মা-বাবার অতি আদরের একমাত্র মেয়ে। মায়ের চাইতে বেশি তার বাবা তাকে আদর করত। মেয়ে জন্মের আগে থেকেই শ্যামার নাম ঠিক করে রেখেছিল শ্যামার মা-বাবা। ছেলে হলে শ্যামল, আর মেয়ে হলে শ্যামা। শ্যামা তার নামের মতই দেখতে শ্যামল বর্ণ ছিল। প্রতিদিন মেয়েদের নির্যাতনের খবরে যখন গোটা বিশ্ব মাতোয়ারা, তখন শ্যামা তার বাবা-মায়ের চোখের মণি হিসেবে বড় হতে থাকে। যখন মাধ্যমিক পরীক্ষাতে এ-প্লাস না পাওয়ার কারণে ছেলেমেয়েদের গায়ে হাত পর্যন্ত তুলতে দ্বিধা করে না তাদের অভিভাবকের, তখন শ্যামার বাবা-মা শ্যামা এ পাওয়াতেই খুশি হয়ে পুরো এলাকা জুড়ে মিষ্টি বিতরণ করে। এক কথায় আদরের দুলালী বলতে যা বোঝায়, তাই হচ্ছে শ্যামা।

শ্যামা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াকালীন সময়ে কেবল ১ম বর্ষ থেকে ২য় বর্ষে উঠার পরপরই তার বিয়ের প্রস্তাব আসে এক দূর-সম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের পরিবার থেকে। শ্যামার মা ছেলের পারিবারিক অবস্থা আর পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়াতে রাজি হইয়ে যান। তবে শ্যামার বাবা কিছুতেই মেয়েকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। তাছাড়া মেয়েকে না বিয়ে দিতে চাওয়ার আরেকটা কারণ ছিল, শ্যামার প্রস্তাবিত শ্বশুর বাড়ি ছিল শ্যামার বাবা বাড়ী থেকে অনেক দূরে। তিনি মেয়েকে এত দূরে বিয়ে দিতে মোটেই রাজি ছিলেন না। তাছাড়া শ্যামার হবু স্বামী রঞ্জিতের কর্মস্থল ছিল কানাডাতে, এটাও উনার বিয়েতে অসম্মতি দেয়ার অন্যতম কারণ ছিল। তবুও শ্যামার মায়ের পীড়াপীড়িতে, আর শ্যামার হবু বর রঞ্জিতের শ্যামাকে সুখে রাখার প্রতিশ্রুতিতে তিনি কন্যাদান করতে রাজি হন। অতঃপর এক শুভদিন দেখে শ্যামার বাবা শ্যামাকে রঞ্জিতের হাতে শপে দেন।

শুরু হয় শ্যামার নতুন জীবন। শ্যামার স্বামী রঞ্জিত তাকে বাশর রাতেই একটা কথা বলে, “আজ থেকে তুমি আর আমি দুজন দুজনার পরম বন্ধু। আমাদের মাঝে কখনও ‘তুমি’ অথবা ‘আমি’ আসতে পারবে না, সবসময় আমরা ‘আমরাতেই’ থাকব। যদি কখনও ভুলেও তোমার আর আমার মাঝে ‘আমি’ অথবা ‘তুমি’ এসে যায়, তবে দুজনে একসাথে সব বাদ দিয়ে আবার ‘আমরাতে’ পৌছাব। শ্যামার কাছে রঞ্জিতের কথাটুকু খুব ভাল লাগে। সে মন থেকে রঞ্জিতকে স্বামী হিসেবে মেনে নেয়। শ্যামার বিবাহ পরবর্তী সময়গুলো বেশ আনন্দেই কাটতে লাগল। তবে তার সুখের দিন বেশিদিন রইল না। মাত্র তিন মাস পরেই রঞ্জিতের কানাডাতে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসল। রঞ্জিতের ফ্লাইটে উঠার আগের দিন রাত থেকেই শ্যামা কান্না করতে থাকে। শ্যামার স্বামী তাকে যতই চুপ করতে বলে, ততই সে কান্না বাড়ায়। শেষমেশ রঞ্জিত যখন বলল যে সে শ্যামাকে কিছুদিনের মধ্যেই কানাডায় নিজের কাছে নিয়ে যাবে, তখন শ্যামা তার কান্না কিছুটা কমায়। এয়ারপোর্টে অশ্রুসিক্ত নয়নে শ্যামা রঞ্জিতকে বিদায় দেয়।

রঞ্জিত বিদেশে চলে যাওয়ার পর থেকেই শ্যামার শাশুড়ির শ্যামার প্রতি বিদ্রুপ ভাব প্রকাশ পেতে থাকে। কথায় কথায় তিনি শ্যামাকে তার কালো হওয়ার জন্য খোটা দিতে থাকেন। শ্যামা তেমন একটা রান্নাবান্নার কাজ পারত না, এটা নিয়েও শ্যামার শাশুড়ি তাকে কথা শোনাত। শ্যামা এসব কিছুই তার স্বামী রঞ্জিতকে জানাত না, কারণ রঞ্জিতের মাতৃভক্তি শ্যামার ভাল করেই জানা ছিল। শ্যামা নিজের পরিবারকেও কিছু জানাতে পারত না, কারণ তারা এসব শুনলে তাকে বাবার বাড়ি নিয়ে যাবে। শ্যামা তার শাশুড়ির মন যোগাতে অনেক চেষ্টা করে, তবু তার শাশুড়ির মন কিছুতেই গলে না। আমাদের সমাজের সব সাধারণ গৃহবধুর মতই শ্যামা রঞ্জিতের মায়ের অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে থাকে।

কিছুদিন পর শ্যামার শাশুড়ি হঠাৎ করেই রঞ্জিতের এক দূর-সম্পর্কের মামাকে বিয়ে করেন। বিয়ে করার পর থেকে শ্যামার নতুন শ্বশুর তাদের সাথেই থাকতে চলে আসে। শ্যামার নতুন শ্বশুরের আচার আচরণ শ্যামার মোটেই পছন্দ হয় না। ওদিকে শ্যামার স্বামী রঞ্জিত এই খবরে অনেকতাই ভেঙ্গে পড়ে। সে ১ মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসে। এবার আসার পর রঞ্জিতের তার মায়ের সাথে তুমুল ঝগড়া হয়। শ্যামা তবুও তার স্বামীকে বোঝায়, “মা একাকী মানুষ। উনার সঙ্গ দেয়ার তো কেউই ছিল না! তুমি থাক বিদেশে, আর আমিও পরের মেয়ে। এক দিক দিয়ে উনার জন্য ভালোই হয়েছে। উনার বুড়ো বয়সে সময়টা অন্তত ভাল কাটবে।” স্ত্রীর কথা শুনে রঞ্জিত শান্ত হয়। রঞ্জিতের ছুটিতে থাকাকালীন পুরো সময়টা জুড়ে শ্যামা মা-ছেলের বিবাদ শান্ত করাতে লেগে থাকে।

রঞ্জিত চলে যাওয়ার পর থেকে শ্যামার শাশুড়ি আবার একইরুপে শ্যামার সাথে অযথা ঝগড়া করতে থাকে। তবুও শ্যামা চুপচাপ সব কিছু মেনে নেয়। তবে একবার শ্যামার নতুন শ্বশুর যখন শ্যামার ইজ্জতে হাত দেয়ার চেষ্টা করে, তখন শ্যামা আর চুপটি করে বসে থাকে না। সে ততক্ষানৎ তার বাবার বাড়ি চলে আসে। এবার শ্যামা তার স্বামীকে সবকিছুই জানায়, শ্যামার স্বামী তাকে বাবার বাড়িতেই থাকার পরামর্শ দেয়। শ্যামার বাবা আইনের সহযোগিতা নিতে চাইলে শ্যামা উনাকে না করে দেয়। বর্তমানে শ্যামা তার স্বামীর নিকট যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমাদের সমাজে এখনও অনেক শ্যামা আছে যারা মুখ বুঝে স্বামীর সংসারে অনেক অত্যাচারই ভোগ করে থাকে। শুধুমাত্র আমাদের সামাজিক দৃষ্টিকোণ যদি ছেলের স্ত্রীকে পর হিসেবে না দেখে নিজের মেয়েতে রূপান্তর করা যেত, তবে এই সমাজে শ্যামাদের তাদের স্বামীর সংসার ছাড়তে হত না। তবে এসব বলে লাভ কি? আজকের শ্যামারাই যখন আগামীতে শাশুড়ি হইয়, তখন তারাও একই কাজ করে থাকে। সেটা যদি নাই হত, তবে কি আর বর্তমান যুগে এসেও মেয়েদের এমন অত্যাচার ভোগ করতে হয়?

দেশসংবাদ/জেএ

সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
সম্পাদক ও প্রকাশক
এফ. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. আবদুস সবুর মিঞা (অব.)
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৮০/২ ভিআইপি রোড, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।।
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft