ঢাকা, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ || ৫ আশ্বিন ১৪২৬
শিরোনাম: ■ ক্যাসিনো খালেদকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার ■ ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশি যুবককে ধরে নিয়ে হত্যা করলো বিএসএফ ■ সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন ■ ক্যাসিনোর শহর বানিয়েছিল বিএনপি ■ ৭ দিনের রিমান্ডে যুবলীগের খালেদ ■ নজরদারিতে সম্রাট, শিগগিরই গ্রেফতার! ■ সব অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে ■ যুবলীগ নেতা খালেদকে গুলশান থানায় হস্তান্তর ■ মার্কিন ড্রোন হামলায় আফগানিস্তানে নিহত ৩০ ■ খুনি নূর চৌধুরীর অবস্থান প্রকাশে বাধা নেই ■ ক্যাসিনোর সাথে জড়িতদের নাম বলছেন যুবলীগ নেতা খালেদ ■ নারায়ণগঞ্জে একই পরিবারের ৩ জনকে গলা কেটে হত্যা
নুসরাত হত্যা মামলায় আত্মপক্ষের নির্দোষ দাবি
মফিজূররহমান, ফেনী
Published : Wednesday, 11 September, 2019 at 8:56 PM

সোনাগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন আসামিরা। সোমবার ০৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ফৌজধারী কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করেন আসামিরা।

এ সময় আসামিরা পিবিআই হেফাজতে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাদের উপর শারীরিক ও মানষিক নির্যাতনের আদ্যেপান্ত আদালতের সামনে তুলে ধরে সাফাই সাক্ষী দিবেনা জানিয়ে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন। ১৬ আসামির উপস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে হত্যা মামলার বাদী নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলমকে ফের জেরা করেন আসামি হাফেজ আব্দুল কাদেরের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু। এরপর আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ ৩৪২ ধারায় আসামিদের পরীক্ষা নীরিক্ষা করার জন্য পিপি হাফেজ আহামদকে আদেশ দেন। প্রথমে পিপি মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদ দৌলার বক্তব্য জানতে চান।

জবাবে সিরাজ জানান,তার সঙ্গে কারাগারে থেকে কোন আসামি সাক্ষাত করেননি,তিনি কাউকে হত্যার নির্দেশ দেননি, পিবিআই বৈদ্যুতিক শট সহ শারীরিক নির্যাতন করে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করে। তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে নুসরাতকে নিজের মেয়ের মতো দাবি করে তার হত্যার বিচার চেয়ে সাফাই সাক্ষী দিবেনা জানিয়ে লিখিত বক্তব্য আদালতে পেশ করেন।

এরপর পিপি আসামি নুর উদ্দিনের অপরাধ বর্ননা করে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন,তাকে গ্রেফতারের পর স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ঢাকা পিবিআই সদর দপ্তরে তার উপর দুই দিন ধরে  শারীরিক নির্যাতন চালায়। এ সময় তাকে বৈদ্যুতিক পাখার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখে,বৈদ্যুতিক শট দেয়া দেয়। স্বীকারোক্তি আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে আমাকে  চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো হয়। পরে ফেনীর আদালতে এনে পিবিআই কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ম্যাজিষ্ট্রেট তার কাছে লিখিত কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলে।

সে নিজেকে নির্দোষ বলে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করলে ম্যাজিষ্ট্রেট তাকে লাথি দিয়ে ফেলে দিয়ে পুনরায় রিমান্ডে দেয়ার ভয় দেখায়। পরে বাধ্য হয়ে ম্যাজিষ্ট্রেটের লিখিত কাগজে স্বাক্ষর করেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সাফাই সাক্ষী দিবেনা জানিয়ে আদালতে লিখিত বক্তব্য জমা দিয়ে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন।

এরপর পিপি আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমের অপরাধ বর্ননা করে তার বক্তব্য জানতে চাইলে সে আদালতকে জানায়, গত ১ এপ্রিল থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সোনাগাজীতে কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করেন। পিবিআই তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে সেই অভিযোগের গত ১ ও ৩ এপ্রিল সিরাজের সাথে কারাগারে সাক্ষাত করতে যায়নি, ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার পর মাদ্রাসার হোস্টেলে বৈঠক করেননি, ৫ এপ্রিল বিকালে ঢাকা গিয়ে ৬ এপ্রিল সকাল ৮টার পর সোনাগাজীতে ফিরে তার বাড়িতে অবস্থান করেন। এসবের প্রমাণ হিসেবে পিবিআইর কাছে রক্ষিত তার ব্যবহৃত মোবাইলের কললিষ্টের ভয়েস রেকর্ড ও লোকেশনের কথা উল্লেখ করেন। পিবিআই তাকে গ্রেফতারের পর সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য তার মোবাইল নিজেই হস্তান্তর করেন। সে আদালতে আরো জানায়, তার মোবাইলে অটো রেকর্ড থাকার কারনে গত ২৬ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত যার যার সঙ্গে কথা হয়েছে সব রেকর্ড রয়েছে।

পিবিআই এসব রেকর্ড দেখে তার কোনো সম্পৃক্ততা না পেয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তার উপর চরম শারীরিক নির্যাতন চালায়। পিবিআই তাকে স্বীকারোক্তির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিলে তিনি আগে থেকে লিখা কাগজে স্বাক্ষর আদায় করে। এসময় বিচারক তাকে প্রশ্ন করেন তাহলে তোমাকে আসামি কেন করা হয়েছে প্রশ্ন করলে শামীম বলেন দলীয় কোন্দলে সোনাগাজীর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন ও কাউন্সিলর মামুন ষড়যন্ত্র করে তাকে আসামি করে।

নিজেকে নির্দোষ বলে সাফাই সাক্ষী দিবেনা জানিয়ে লিখিত বক্তব্য আদালতে জমা দেন। আসামি যোবায়েরের অপরাধ বর্ননা করে তার কাছে পিপি বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আদালতকে জানান, অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির দাবিতে একবার মানববন্ধন করা ছাড়া কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। শুধুমাত্র মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করার কারণে পিবিআই তাকে ধরে নিয়ে চরম শারীরিক নির্যাতন করে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পিবিআইর লিখিত কাগজে স্বাক্ষর করেন।

 বিচারক তাকে এসময় প্রশ্ন করেন কি কারণে তোমাকে আসামি করা হয়েছে? উত্তরে তিনি জানান নুসরাতের ছোট ভাই রায়হান শিবিরের সক্রীয় কর্মী, গত বছর ১৫ আগষ্ট সে মাদ্রসায় বঙ্গবন্ধুর ছবি যুক্ত সাটানো ব্যানার ছিড়ে ফেলা ও মাদ্রাসার ছাত্রীদের ইভটিজিং করায় তাকে শাষন করার পর থেকে সে তার উপর ক্ষিপ্ত হয়। সে সময়ের প্রতিশোধ নিতে তারা তাকে মামলায় জড়িত করেন।

এছাড়াও রুহুল আমিনের সমর্থক হওয়ার কারনে পৌর মেয়র খোকনও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকে আসামি করতে নুসরাতের ভাইকে চাপ দেয়। সাফাই সাক্ষী দিবেনা জানিয়ে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করে আদালতে লিখিত বক্তব্য জমা দেন। আত্মপক্ষ সমর্থন করে আসামি কামরুন মনি আদালতকে জানায় সে ঘটনার সময় ৫ মাসের গর্ভবতী ছিলেন, পিবিআই তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানের জন্য শারীরিক ও মানষিকভাবে নির্যাতন করেন।

তার উপর নির্যাতন দেখে সহ্য করতে না পেরে হেফাজতে থাকা অপর আসামি যোবায়ের তাকে  মনির পরিবর্তে নির্যাতনের জন্য পিবিআই কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ জানায়। এক পর্যায়ে তার পেটে লাথি মেরে গর্ভের বাচ্চা নষ্টের ভয় দেখিয়ে তাদের লিখিত কাগজে সাক্ষর আদায় করেন। বিচারক তার কাছে জানতে চান নুসরাতকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে উত্তরে সে জানায় ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তিনি জানেন না। ন্যায় বিচার প্রার্থনা করে লিখিত বক্তব্য আদালতে জমা দেন।

আসামি উম্মে সুলতানা পপি আদালতকে জানান, পিবিআই তাকে উলঙ্গ করে চোখ বেঁধে চরম শারীরিক ও মানষিক নির্যাতন করে তাদের লিখিত কাগজে স্বাক্ষর আদায় করেন। সে সাফাই সাক্ষী দিবেনা বলে আদালতে লিখিত বক্তব্য জমা দেন । বিচারক তাকে কেন আসামি করা হয়েছে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, শুধুমাত্র সিরাজের আত্মীয় হওয়ার কারণে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে,নুসরাত যখন অগ্নিদগ্ধ হয়ে সাইক্লোন সেন্টারের নিচে আসে তখন সে হলে ছিলেন যাহা সাক্ষী  আদালতে সাক্ষী দিয়েছেন, ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তিনি জানেন না বলেও জানান। আসামি আফছার উদ্দিন বিচারকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, নুসরাতের ঘটনাটি শতভাগ আত্মহত্যা।

পর্যায়ক্রমে অপর আসামিরাও তাদের উপর পিবিআইর চরম নির্যাতনের বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং সাফাই সাক্ষী দিবেনা জানিয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবী করে লিখিত বক্তব্য আদালতে জমা দেন। আসামিরা যখন আদালতের তাদের উপর নির্যাতনের বর্ননা দিচ্ছিলেন তখন আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলম। সন্ধ্যায় আদালতের বিচারক আগামি বুধবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করে বিচার কাজ মুলতবি করেন।

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। এর আগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দেয় তারা। এই ছাত্রীর পরিবারের ভাষ্যে, ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তার কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। তারই জেরে মামলা করায় নুসরাতকে আগুনে পোড়ানো হয়। ওই মামলার পর সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

দেশসংবাদ/এসকে

মতামত দিতে ক্লিক করুন
আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
সম্পাদক ও প্রকাশক
এফ. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. আবদুস সবুর মিঞা (অব.)
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft