ঢাকা, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ || ২ কার্তিক ১৪২৬
শিরোনাম: ■ সন্ত্রাসীদের আত্মসমর্পণ করতে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ■ বড় ভাইয়ের নির্দেশে আবরারকে ডেকে এনে মুখে কাপড় দিয়ে মারা হয় ■ সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ ডেকেছে ঐক্যফ্রন্ট ■ ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ■ ফের কাশ্মীরে গোলাগুলি, ৩ সন্ত্রাসী নিহত ■ জাপানে টাইফুন হাগিবিসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ ■ বালিশকাণ্ডে গণপূর্তের ১৬ কর্মকর্তা বরখাস্ত ■ ফেনীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৭ মামলার আসামি নিহত ■ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ড্র ■ ডিসেম্বরে বহুল প্রত্যাশিত ই-পাসপোর্ট উদ্বোধন ■ সম্রাট মারা গেলে দায় নেবে কে? ■ আবরার হত্যাকাণ্ডে কূটনীতিকদের বিবৃতি ‘অহেতুক’
তাহিরপুরে বিজয় সিংহের হাবেলী দুর্গঃ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি
কামাল হোসেন, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
Published : Tuesday, 1 October, 2019 at 9:32 PM, Update: 01.10.2019 10:29:48 PM

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাউড় রাজ্যের রাজধানী’র বিজয় সিংহের হাবেলী  দুর্গকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রত্নতত্ত্ব স্থানটিকে সরকারি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর এই প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনাকে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংরক্ষিত স্থান হিসেবে  ঘোষণা করে।

প্রাপ্ত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৪ নভেম্বর থেকে তাহিরপুর উপজেলার প্রগঐতিহাসিক বিজয় সিংহের রাজত্বকালের লাউড় রাজ্যের রাজধানী’র হাবেলী যাবে লী দুর্গ খননের প্রাথমিক কাজ শুরু করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্রগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আতাউর রহমান খনন কাজ শুরু’র পর বলেছিলেন, ‘তাহিরপুরের লাউড়ে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে, যেটি কয়েক যুগকে যুক্ত করবে।’

ইতিহাস পর্যালোচনায় পাওয়া যায়, প্রাচীনকাল হতে শ্রীহট্ট (সিলেট) কয়েকটি খন্ড খন্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ত্রৈপুর রাজ বংশের অধ্যুষিত স্থান ত্রিপুরা রাজ্য বলে সাধারণত কথিত হয়। এই রাজ বংশের অধিকার এক সময় বরবক্রের সমস্ত বাম তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

শ্রীহট্টের তিন ভাগ তিন জন পৃথক নৃপতি দ্বারা শাসিত হত। গৌড়, লাউড় ও জয়ন্তিয়া এই তিন খন্ডের নৃপতির অধীনস্ত ছিলেন আরও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমি মালিক। লাউড় রাজ্য ছিল সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ জেলার কিয়দংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। লাউড় ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য। তাহিরপুরের সীমান্ত এলাকায় লাউড়ের রাজধানী ছিল। এই রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ হলহলিয়া গ্রামে এখনো বিদ্যমান। এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কেশব মিশ্র। এরা ছিলেন কাত্যান গোত্রীয় মিশ্র। তাদের উপাধি ছিল সিংহ। খ্রিস্টীয় দশম অথবা একাদশ শতকে তিনি কনৌজ থেকে এখানে আসেন।

দ্বাদশ শতকে এখানে বিজয় মাণিক্য নামের নৃপতি রাজত্ব করতেন। কারো কারো মতে বঙ্গ বিজয়ের পর রাঢ় অঞ্চল মুসলমানদের হাতে চলে যাওয়ায় সেখানকার বিতাড়িত ও পরাজিত সম্ভ্রান্তজনেরা প্রাণ ও মান বাঁচানোর জন্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়িয়েছিলেন। এদেরই একজন এখানে এসে রাজত্ব গড়ে তোলেন। রাঢ় শব্দ হতেই লাউড় শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। লাউড় রাজ্যের রাজধানী লাউড় ছাড়াও জগন্নাথপুর ও বানিয়াচংয়ে আর দুটি উপ রাজধানী ছিল।

ঐতিহাসিক ডব্লিউ হান্টারের মতে সম্ভবত ১৫৫৬ খি. লাউড় রাজ্য স্বাধীনতা হারায় এবং মোগলরা এর নিয়ন্ত্রক হন। লেখক সৈয়দ মর্তুজা আলী তাঁর রচিত ‘হযরত শাহ্জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’ গ্রন্থে উলে­খ করেছেন মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.) লাউড়ের রাজা গোবিন্দ সিংহ তাঁর জ্ঞাতি ভ্রাতা জগন্নাথপুরের রাজা বিজয় সিংহের সাথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিরোধে লিপ্ত হয়েছিলেন। এর জের ধরেই বিজয় সিংহ গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন।

বিজয় সিংহের বংশধরগণ এ হত্যার জন্য গোবিন্দ সিংহকে দায়ী করে তার বিরুদ্ধে মোগল সম্রাট আকবরের রাজদরবারে বিচার প্রার্থনা করেন। এ ঘটনার বিচারের জন্য সম্রাট আকবর দিল্লি থেকে সৈন্য পাঠিয়ে গোবিন্দ সিংহকে দিল্লিতে ডেকে নেন। বিচারে গোবিন্দ সিংহের ফাঁসির হুকুম হয়।

গোবিন্দ সিংহের অপর নাম ছিল জয় সিংহ। একই সময়ে জয়সিংহ নামের অপর এক ব্যক্তি রাজা গোবিন্দ সিংহের সঙ্গে সম্রাট আকবরের কারাগারে আটক ছিলো। ভুলবশত প্রহরীরা গোবিন্দ সিংহের পরিবর্তে ঐ জয়সিংহকে ফাঁসিতে ঝুলান। গোবিন্দ সিংহের প্রাণ এভাবে রক্ষা পাওয়ায় তিনি কৌশলে সম্রাট আকবরের কাছ থেকে নানা সুযোগ গ্রহণ করেন। তিনি সম্রাট আকবরের নিকট প্রাণভিক্ষা চান ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। গোবিন্দ সিংহের নাম হয় হাবিব খাঁ। সম্রাট আকবর গোবিন্দ সিংহকে তাঁর হৃতরাজ্য পুনরায় দান করেন।

অবশ্য শর্ত দেওয়া হয় হাবিব খাঁ সম্রাট আকবরের বশ্যতা স্বীকার করবেন এবং সম্রাটের খাজনার পরিবর্তে ৬৮ খানা কোষা নৌকা নির্মাণ করে সম্রাটকে সরবরাহ করবেন। এই নৌকাগুলো খাসিয়াদের আগ্রাসন হতে আত্মরক্ষার জন্য মোগল ও স্থানীয়  বাহিনী কর্তৃক রণতরী হিসাবে ব্যবহার করা হবে। প্রাচীন নানা গ্রন্থে উলে­খ রয়েছে হাবিব খাঁ’র পৌত্র ছিলেন মজলিস আলম খাঁ। মজলিস আলম খাঁ’র পুত্র ছিলেন আনোয়ার খাঁ।

তিনি খাসিয়াদের উৎপাতের কারণে স্বপরিবারে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের লাউড় ছেড়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে চলে যান এবং সেখানে অস্থায়ী ভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। এই বংশেরই উমেদ রাজা লাউড়ে একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এই দুর্গের ধ্বংসাবশেষই লাউড়ের হাউলী, হলহলিয়া বা হাবেলী নামে পরিচিত। বর্তমানে এই দুর্গের ভগ্নাবশেষ দেখা যায়।

প্রতিটি প্রকোষ্ঠের কারুকার্য দেখলে যে কেউ মনে করবেন এখানে সম্ভ্রান্ত কোন রাজা বা নৃপতি বাস করতেন। প্রাচীন এই স্থাপনা  ক্রমেই ধ্বংসের পথে ছিল। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, হাওরাঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শন লাউর রাজ্য ঐতিহাসিক স্থাপনার স্বীকৃতি এবং সরকারের প্রত্যেক  সম্পদের তালিকাভুক্ত করায় এখানকার জেলা প্রশাসক হিসাবে আমি খুশি।

খনন ও গবেষণায় সাধ্যমত সহযোগিতা করবো। আমি মনে করি এখানকার পুরাকীর্তি পর্যটন বিকাশের সহায়ক হবে।বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের অনেকাংশই এই অঞ্চলে বিদ্যমান রয়েছে, এখানে সঠিকভাবে গবেষণা করতে পারলে এই অঞ্চলের সঠিক ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে, যা সিলেটের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

এই প্রত্নতত্ত্ব স্থানটি সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় প্রত্নতত্ত্ব  অধিদপ্তর, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই প্রত্নতত্ত্ব স্থানটি সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় সঠিকভাবে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার মাধ্যমে এখানকার প্রাচীন পটভূমি  জানা যাবে এবং এই অঞ্চলে প্রত্নতত্ত্ব প্রেমী ও প্রত্নতত্ত্ব পর্যটন আরো বিকশিত হবে।

দেশসংবাদ/এসকে


আরও সংবাদ   বিষয়:  তাহিরপুরের   সংরক্ষিত   পুরাকীর্তি   



মতামত দিতে ক্লিক করুন
আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. আবদুস সবুর মিঞা (অব.)
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft