ঢাকা, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০ || ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ বাড়ি বাড়ি প্রশ্ন পাঠিয়ে প্রাথমিকের পরীক্ষার নেয়া হচ্ছে ■ এই ইনহেলার ফুসফুসে করোনা সংক্রমণ রুখে দিতে পারে ■ সেপটিক ট্যাংকে পড়ে মা-ছেলের মৃত্যু ■ ওয়াশিংটন ডিসি ধীরে ধীরে চালু হচ্ছে ■ পিসিআর ল্যাবের পরীক্ষায়ও ডা. জাফরুল্লাহর করোনা পজিটিভ ■ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের হুমকি ■ আরও ২ ইউপি চেয়ারম্যান ও ৩ মেম্বার বরখাস্ত ■ ছুটি শেষ, ঝুঁকি নিয়েই ঢাকায় আসছে মানুষ ■ ৩১ মে থেকে লঞ্চ চলবে, বাড়বে ভাড়া ■ ১০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ একমাসের মধ্যে ■ মেয়েকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা বাবার! ■ ভারতে ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ৬,৫৬৬, মৃত্যু ১৯৪
করোনা কালের কথন
নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়হীনতার শেষ কোথায়!
কাজী এস. ফরিদ
Published : Monday, 6 April, 2020 at 12:43 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল

আমাদের দেশে নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকান্ড ও সমন্বয়হীন পরিকল্পনার নজির সর্বজনবিদিত। এই করোনাকালে তাঁরা তার চূড়ান্ত প্রদর্শনী আমাদের সামনে উপস্থাপন করে চলেছেন। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁরা শুধু বড় বড় কথাই বলে যাচ্ছেন, সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত কোন পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারছেন না। উল্টো প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছেন, আমাদের প্রস্তুতি অনেক উন্নত দেশের চেয়ে ও ভাল! আমাদের প্রস্তুতি কেমন ভাল তা একটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে।

গত  ৫ এপ্রিল এর হিসাব অনুযায়ী, ৫০ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছে এ রকম দেশের মধ্যে পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সবচেয়ে কম করোনা টেস্ট করেছে। অথচ করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রাথমিক মূল নির্দেশ ছিল– ‘টেস্ট, টেস্ট, টেস্ট’, যেটা বর্তমানে পরিবর্তিত হয়েছে- টেস্ট-ট্র্যাক-ট্রিট (পরীক্ষা করো-খুঁজে বের করো-চিকিৎসা করো)। অর্থাৎ প্রথম কাজ হলো পরীক্ষা করানো, আক্রান্ত হলে তার সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের খুঁজে বের করা, পরীক্ষা করা ও চিকিৎসা দেওয়া। আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ প্রতি ১o লক্ষ মানুষের মধ্যে গড়ে মাত্র ১৮টি টেস্ট করেছে, যেখানে প্রতি ১০ লক্ষে নেপাল টেস্ট করেছে ৫২টি, ভারত - ৯৩টি ও পাকিস্তান - ১৫৮টি । এটা কোন গুজব নয়, সরকারি তথ্য! কয়েকদিন আগে যে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের সমতুল্য ছিল (যার কাছে আমেরিকা ও সাহায্য চায়!), সেই বাংলাদেশের চেয়ে ও অনেক গরিব রাষ্ট্র গড়ে বাংলাদেশের চেয়ে ও বেশি টেস্ট করেছে।

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল


যাহোক, একটা পর্যায়ে আমাদের নীতিনির্ধারকরা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেন, গার্মেন্টস ও বন্ধ করলেন; কিন্তু লকডাউন ও করেননি, গণপরিবহন ও বন্ধ করেননি। ফলে সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ যাদের ঢাকায় খাদ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা নাই, তারা দলে দলে গ্রামে ফিরে গেছেন। বাংলাদেশের জনসংখ্যার যে ঘনত্ব এবং গণপরিবহনের যে দুরবস্থা তাতে সামাজিক দূরত্ব ঠিক রাখার কোন সুযোগ ছিল না এবং মানুষ সেটা করতে পারেনি ও। তাছাড়া গ্রামে গিয়ে তারা সামাজিক দূরত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আড্ডাবাজি করছেন। এর জন্যে আসলে দায়ী আমাদের নীতিপ্রণয়নকারীরা, সাধারণ মানুষ নয়। কারণ তাঁরা নিজেরা ও প্রকৃত শিক্ষিত হননি, জনগণকে ও শিক্ষিত করেননি। শিক্ষাকে তাঁরা জ্ঞান বিকাশের মাধ্যম না করে সার্টিফিকেট-সর্বস্ব করে রোজগারের হাতিয়ার করেছেন, ব্যবসার মাধ্যম করে পণ্যে পরিণত করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করেছেন জেলখানায়, গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরেছেন, বিচারবিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁরা সাধারণ মানুষকে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করেছেন, গ্রামে ফিরে  যেতে সহায়তা করেছেন। তাঁরা তাদের  সুবিধাই বুঝেছেন। ঢাকায় থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ত, করোনায় আক্রান্ত ও মারা যাওয়ার সংখ্যা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ত। তাঁরা কেন সেই ঝুঁকি নিবেন! গ্রামে কে কীসে আক্রান্ত হল, করোনায় মরল না তথাকথিত জ্বর-সর্দি-কাশি-স্বাসকষ্টে মরল তার হিসেব কে রাখে! তাঁরা আবার ব্যাংক খোলা রেখেছেন। পুলিশ-সেনাবাহিনী কোন বাছবিচার না করে ব্যাংকারদেরকে অপমানিত করছেন, তাদেরকে রিক্সা থেকে নামিয়ে দিচ্ছেন। তো তাঁরা কি পায়ে হেঁটে ব্যাংকে যাবে?

আমাদের নীতিনির্ধারকরা শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে মনে হয় তামাশা শুরু করেছেন। একদিকে মানুষকে বলছেন ঘরে থাকতে, আরেকদিকে ব্যবসায়িক লাভের কথা চিন্তা করে গার্মেন্টস খুলে দিয়েছেন। আবার এদিকে গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়েছেন। এ মানুষগুলো কি করবে? তারা তাদের কর্মস্থলে কিভাবে যাবে? গার্মেন্টস শ্রমিকগণ পেটের দায়ে - চাকুরী হারানোর ভয়ে অথবা চাকুরী বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে কেউবা পায়ে হেঁটে, কেউবা গাদাগাদি করে পশুর মত মালবাহী ট্রাকে আবার ঢাকায় ছুটলেন। ফেরিঘাটে ও অসম্ভব ভীড় হল। এই মানুষগুলো (অবশ্য উপরতলার লোকেরা তাদের আবার মানুষ মনে করেন না!) করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে কিনা সেটা আপনাদের চিন্তা করার সময় কোথায়! সারাদিন নাটক মঞ্চস্থ করে যখন বেশিরভাগ শ্রমিক ঢাকায় চলে গেছে বা ঢাকার পথে আছে, তখন রাত ১০টায় কেউ গার্মেন্টস বন্ধ করলেন, কেউ ঘোষণা দিলেন ঢাকায় যেন কেউ ঢুকতে না পারে। এখন এই মানুষগুলোর ভাগ্যে আছে রাস্তায় পুলিশ-সেনাবাহিনীর মার্ খাওয়া, আবার গাদাগাদি করে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে গ্রামে ফেরা।

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল


এই মানুষগুলোকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যে ন্যূনতম বেতন দিলেন না, মাথা গোঁজার জন্যে একটু জায়গা দিলেন না। তারা যখন ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর জন্যে বেতন বাড়ানোর আন্দোলন করে, তখন অনেক দেনদরবারের পর মাসে দুই-এক শত টাকা বেতন বাড়িয়ে আপনারা মনে করেন তাদের জন্যে সব করে ফেলেছেন। অথচ নিজেদের বেতন বাড়ানোর সময় তো লক্ষ টাকার কম চিন্তা ও করতে পারেন না।  আপনাদের পুঁজিবাদী মানসিকতা, শ্রমিকদের শোষণ-নিস্পেষণনীতি ও সীমাহীন লোভের কারণেই আজ পৃথিবী সংকটে পড়েছে, সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। উন্নয়ন, আধুনিকতা ও বিশ্বায়নের নামে আপনারা পুঁজিপতিরা সমগ্র প্রকৃতিকে অতিরিক্ত শোষণ করে ধ্বংস করে ফেলেছেন। আবার এই উন্নয়ন, আধুনিকতা ও বিশ্বায়নের নামেই আপনারা ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করেন। আপনাদের দ্বারা প্রকৃতি ধ্বংসের ফলাফল হচ্ছে আজেকের এই করোনা। এটা হল আপনাদের কারণে মানবজাতির উপর প্রকৃতির চরম প্রতিশোধ! আপনাদের পুঁজিবাদী আচরণ ধ্বংসই এখন বেশি প্রয়োজন। আর নীতিনির্ধারক ও পুঁজিপতিদের দায়িত্বশীল আচরণই এখন কাম্য, তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম দুর্ভোগ ও আর কাম্য নয়। 

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল


তবে করোনার এই দুর্যোগে আমাদের ও অনেক নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। করোনা এখন অফিসিয়ালি পৃথিবীর ২০৮ টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে; মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের। আনঅফিসিয়াল হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যু হয়তো আরো বেশি হয়েছে, যদিও এটা হোক সেটা কারোই কাম্য না। পৃথিবীতে আমাদের মত কিছু দেশ আছে যেখানে পর্যাপ্ত টেস্ট না করার কারণে আক্রান্তের প্রকৃত অফিসিয়াল সংখ্যা জানা অসম্ভব; মৃত্যু ও করোনায় হচ্ছে, না জ্বর-সর্দি-কাশি-শ্বাসকষ্টে হচ্ছে তা ও জানা সম্ভব নয়! তবে করোনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে, নিজ নিজ ঘরে থাকতে হবে। ত্রাণ দেওয়ার নামে অনেক লোকের সমাগম করে লোক দেখানো ত্রাণ কার্য্ক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কারণ এতে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। নামাজ সহ সকল ধর্মীয় কর্মকান্ড (সকল ধর্মের) নিজ নিজ ঘরে পালন করতে হবে, কোন স্থানেই কোন ধরণের জনসমাগম করা যাবেনা।

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল

ঢাকায় ফিরতে গার্মেন্টস কর্মীদের ঢল


মক্কা-মদিনায় নামাজ বন্ধ করা প্রসঙ্গে আমাদের দেশে কিছু হুজুর (যারা সাধারণত ওয়াজ করেন) বলছেন, মক্কা-মদিনা কি করল সেটা দেখার নাকি তাদের সময় নাই, বাংলাদেশে তারা মসজিদে নামাজ বন্ধ করতে দিবে না। এই কথা যারা বলে সত্যিকার অর্থেই তাদের ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নাই। মক্কা-মদিনায় মসজিদ ও বন্ধ হয়নি, নামাজ ও বন্ধ হয়নি, শুধু মসজিদে সাধারণ মানুষের যাওয়া বন্ধ করা হয়েছে, কারণ সংক্রমণ ঠেকাতে এর চেয়ে ভাল উপায় আর নাই। আমাদের দেশে ও নামাজ-মসজিদ বন্ধ করার কথা কেউ বলেনি। মসজিদ চালু থাকবে, ইমাম-মুয়াজ্জিন - তাঁরা কয়েকজন মিলে মসজিদে নামাজ আদায় করবেন, বাকিরা সবাই নিজ নিজ ঘরে নামাজ আদায় করবেন । রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকলে বাইরে না যেতে ইসলাম ধর্মেই বলা আছে, সে ক্ষেত্রে মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ পড়লে কোন সমস্যা হবে না। তাই আসুন সবাই নিজ নিজ ঘরে থাকি, বাজারে-মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া বন্ধ করি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, যেখানে-সেখানে থুথু-কফ না ফেলি, নিজের ঘরের জানালা-গ্রিল দিয়ে ও থুথু-কফসহ অন্যান্য যেকোন বর্জ না ফেলি (এটা খুবই নোংরা ও বিশ্রী অভ্যাস); নিজে রক্ষা পাই - অন্যকে ও রক্ষা করি। আর ঘরে থাকার কারণে যাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে তাদের জন্যে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সরকারিভাবেই থাকা উচিত, সেই সাথে সমাজের যারা সামর্থবান তাদের ও এই বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করা উচিত। কিন্তু এখন সবাইকে যে ভাবেই হোক ঘরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই শুধু করোনার সংক্রমণ ঠেকানো যেতে পারে বলে আশা করা যায়।

লেখক: কাজী এস. ফরিদ
সহযোগী অধ্যাপক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
email: [email protected]


দেশসংবাদ/কেএসএফ/এফএইচ/mmh


আরও সংবাদ   বিষয়:  করোনা   গার্মেন্টস  




আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা আপডেট
টিকা না আসা পর্যন্ত করোনাকে সঙ্গী করেই বাঁচতে হবে
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft
logo
up