ঢাকা, বাংলাদেশ || সোমবার, ২৫ মে ২০২০ || ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ ইতিহাস গড়ল নিউ ইয়র্ক টাইমস ■ শেখ হাসিনাকে নরেন্দ্র মোদির ঈদ শুভেচ্ছা ■ চট্টগ্রামে ইউপি সদস্যকে গুলি করে হত্যা ■ রাশিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ ছাড়াল ■ আসসালামু আলাইকুম, সবাইকে উষ্ণ শুভেচ্ছা ■ যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু এক লাখ ছুঁই ছুঁই ■ পুলিশে আক্রান্ত ৩৯১৮, সুস্থ ১০০৮ ■ যুক্তরাষ্ট্রে দেড় লাখ পিপিই রফতানি ■ সিরাজগঞ্জে ঈদের নামাজে সিজদাবস্থায় ইমামের মৃত্যু ■ ঈদের আগের রাতে আ’লীগ নেতাকে জবাই করে হত্যা ■ হাঁটু পানিতে ঈদের নামাজ আদায় ■ করোনা প্রতিরোধে সরকারের সমন্বয় নেই
করোনা সাহিত্য, বিশ্বব্যবস্থা এবং আধুনিকতাবাদের ইতিহাস ও দার্শনিক বোঝাপড়া!
মোঃ শাহ জালাল
Published : Monday, 6 April, 2020 at 4:16 PM, Update: 06.04.2020 6:28:38 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

মোঃ শাহ জালাল

মোঃ শাহ জালাল

করোনার সাথে সাহিত্য শব্দ দেখে অনেকেই হয়তোবা হকচকিয়ে ওঠেছেন! শব্দটির এক প্রকার তাৎপর্য রয়েছে। অবশ্য এটা আমার মৌলিক চিন্তার প্রকাশ নয়। ‘করোনা সাহিত্য’ শব্দযুগল আমি ধার করেছি দক্ষিন এশিয়ার অন্যতম রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিসার্চার শ্রদ্ধেয় আলতাফ পারভেজ স্যারের নিকট থেকে। সাহিত্য  সমাজ কিংবা মানব জীবনের দর্পণ! তদুপরি করোনা অধ্যায় আমাদের মানবজীবন, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি গোটা বিশ্বব্যবস্থার ভেতর ও বাহিরের রূপকে দর্পণের মতো করে আমাদের সামনে হাজির করেছেন।

আমাদের বোধোদয় হয়েছে এতোদিনকার ফুলে- ফেঁপে ওঠা বিশ্বটা আসলে রোগাক্রান্ত প্রায়। বিশ্বব্যবস্থার এই রোগের বহিঃপ্রকাশ হলো আজকের দিনের করোনা।অবশ্য পূর্বেও করোনার মতো এরকম নানান পরিস্থিতির শিকার হয়েছে বিশ্ব কিন্তু বিশ্বের হর্তাকর্তাদের নিউরনগলিতে এই সতর্কবার্তা বিন্দুমাত্র ছাপ ফেলতে পারেনি। বিশ্ব যেখানে বস্তবাদী ইহজাগতিক ভাবনা, রাষ্ট্রিভিত্তিক কাঠামোয় নজর, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং মুনাফাকেন্দ্রিক চিন্তায় বিভোর সেখানে মানুষ, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের নিরাপত্তার কথা গৌণ হয়ে যায়,অবহেলায় পর্যবসিত হয় সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলবার এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলি।

পুরো পৃথিবী আজ থমকে গিয়েছে। চারদিকে শুধু ভয় ও আতঙ্কের লোমহর্ষক গল্প! লাশের হিসাব এবং আক্রান্তদের ভয়াবহ অবস্থা বিশ্বব্যাপী জনমনে এক ভীতি ও দ্বিধার দেয়াল রচিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের চলাফেরায়, খাদ্যাভ্যাসে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে, যোগাযোগব্যবস্থায়,স্বাস্থ্যসেবায়, রাজনীতিতে বিশেষ করে অর্থনীতিতে।

এমনকি করোনা পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতি কোন দিকে ধাবিত হবে কিংবা হতে পারে তা নিয়ে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলির হতাশার ইয়ত্তা নেই! যদিও পরাশক্তিগুলি একে অপরকে দোষারোপ করছে এর জন্য।করোনা ভাইরাস পরবর্তী অর্থনীতি মোকাবেলার কথা ভেবে জার্মান স্টেট মিনিস্টার আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন!

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস বলেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাম্প্রতিক এই করোনা ভাইরাস। অর্থনৈতিক মন্দায়(Recession) পর্যবসিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব আবারও। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ দশকে(১৯৩০ সাল) এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে (২০০৮ সাল) পৃথিবী অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয়েছিল। পুঁজির ধর্ম এমনটাই! তবে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমরা ইতিহাস ও সময় থেকে শিক্ষা নেইনা। আমরা মেতে থাকি বস্তুবাদী জগতের ক্ষমতা লিপ্সায় এবং কর্তৃত্ববাদের আসনে আসীন হওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। আগামী বিশ্বের নাটাই কে ঘুরাবে করোনা সে প্রশ্নও আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমান পৃথিবী কিংবা বিশ্বব্যবস্থা পূর্বে কেমন ছিল এবং আজকের দিনের বর্তমান অবস্থা পরখ করার জন্য আমাদের করোনার নিমিত্তে ইতিহাস এবং দার্শনিক পাঠ অবশ্যম্ভাবী। ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে  সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা (Feudalism) ছিল। এরপর সময়ের পরিক্রমায় শিল্পযুগ, আলোকায়ন, আধুনিকতাবাদ। মূলত ১৬ এবং ১৭ শতকের পূর্বে ধর্ম এবং রাজাদের দ্বারা রাজনীতি পরিচালিত হতো। মোদ্দাকথা ইশ্বরকেন্দ্রিক ছিল বিশ্বব্যবস্থা। তখনকার সময়ে চার্চ এবং পাদ্রীদের বেহাল অবস্থার কারনে ধর্ম এবং ইশ্বর থেকে মুখ ফিরিয়ে মানবরচিত চিন্তাকাঠামো আধুনিকতাবাদ ( modernism) এর জন্ম নেয়।

ফলে বস্তবাদী এক জগতকে আঁকড়ে ধরে পুরো পৃথিবী। মডার্নিজমের ফলে ধর্ম( বিশ্বাসের প্রাধান্য) এবং আধ্যাতিকতার পরিবর্তে আসে জাতি রাষ্ট্র এবং দেশপ্রেম। উত্থান ঘটে জাতি রাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবাদের কন্সেপ্টের। বিশ্বাস এবং ধর্মের স্তুতি বাক্যকে তোয়াক্কা না করে  যুক্তির (logic) ফ্রেমে বন্দি করে ফেলল মানুষ নিজেকে। ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকলো মানুষ! ফলে মডার্নিজমের সাথে সাথে এনলাইটেনমেন্ট, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা,ভোগবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে পুঁজিবাদের উত্থাণ সেই সাথে ব্যক্তিসাতন্ত্রবাদের (Individualism) এর সৃষ্টি।

মডার্নিজম মনে করেছিল, বিজ্ঞান দিয়ে মানব ও এই ধরনীর সব সমস্যাগুলোকে এক এক করে দূরীভূত করে দিবে। শান্তি, প্রগতি এবং সমৃদ্ধি অর্জন করবে।

বর্তমান পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে আমরা সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। বিজ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে । কারণ,এই বিজ্ঞান ভ্যালু ফ্রী। কাজেই এই বিজ্ঞানকে যে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করছে এবং আজও করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই বিজ্ঞান পুঁজিবাদের গোলকায়নে আবদ্ধ। আধুনিকতার নিরন্তর পরিবর্তন ও নতুনত্বের অভিঘাত আমাদের অভিভূত করে। আমরা এই ধাবমান অতিগতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে না পেরে খেই হারিয়ে ফেলি।বিজ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মানুষ মারার হাতিয়ার বানানো শিখিয়েছে। প্রশ্ন এবং সমস্যা বিজ্ঞানকে নিয়ে নয়, বিজ্ঞানের অসঙ্গতি এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে। এতে করে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা হয়না!

আমাদের মনে রাখা আবশ্যক ফরাসী বিপ্লব কিংবা মডার্নিজমের পূর্বে  চার্চ, পাদ্রী এবং ধর্মকেন্দ্রিক যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল পাশ্চাত্যে মানে ইউরোপে তা কোনক্রমেই প্রাচ্যের কিংবা আমাদের সমস্যা ছিলনা অথচ পুরো বিশ্বব্যাপী এর বিস্তৃতি ঘটলো।

এর জন্য উপনিবেশবাদের সময় কালে আমাদের ফিরে যেতে হবে। উপনিবেশবাদের সময়ই বিশ্বব্যাপী পশ্চিমাদের নতুন এই চিন্তাকাঠামোর জ্ঞান  ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। মূলত উপনিবেশবাদের উত্থান গুটিকয়েক কারনে হয়েছে। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে রেঁণেসা (আধুনিকতার উত্থাণ, ব্যক্তিবাদ, সেক্যুলারিজম), ১৮০০ শতকের এনলাইটেনমেন্ট (যুক্তি, তর্ক শাস্ত্র, দর্শন, বিজ্ঞান) এবং সর্বশেষে আধুনিকতাবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ। এই প্রেক্ষাপটগুলি এক ধরনের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির উত্থাণ ঘটালো। সেই সময় ইউরোপে মডার্নিজমের ফলে শিল্পের বিকাশ হতে লাগলো।

ফলে ইউরোপে শিল্পযুগ শুরু হয়ে যাবার পর, কারখানার বিস্তারের পর অধিক মাত্রায় রিসোর্সের জন্য ইউরোপের দেশগুলি (ওলন্দাজ, ফ্রান্স, ব্রিটিশ) ভারতবর্ষ তথা অন্যান্য দেশগুলিতে দ্রুত উপনিবেশবাদের বিস্তার ঘটাতে থাকে, শাসন করতে থাকে প্রায় পুরো বিশ্বকে। তাদের পাশ্চাত্য এই জ্ঞান আমাদের উপনিবেশগুলিতেও ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস চালাতে লাগলো। পশ্চিমের আরোপিত জ্ঞানের অধীনে চলে গিয়েছে প্রাচ্য। পশ্চিমারা প্রাচ্যকে দেখেছে তাদের চিন্তার ফ্রেইমে।

তারা দেখিয়েছে সবদিক থেকে প্রাচ্য থেকে তারাই স্ট্যান্ডার্ড । ফলে প্রাচ্য কিংবা অন্যান্য দেশ ভোগলিক ভাবে তাদের দেশের হলেও চিন্তা, ভাবনায় এবং মননে পশ্চিমার ফ্রেমে বন্দী। ফিলিস্তিনি চিন্তাবিদ এবং তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদ তার ওরিয়েন্টালিজম বইয়ে অত্যন্ত চমৎকার ভাবে এসকল বিষয়বস্তু বাস্তবিকতার মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। ফলে প্রায় পুরো পৃথিবীর সব দেশই শিক্ষাব্যবস্থায়, সংস্কৃতিতে চিন্তায় এবং সভ্যতায় আজ পশ্চিমাদের আধুনিকতাবাদকে ধারন করেছে!

উপরোক্ত এতো লম্বা আলোচনার বয়ান দেয়ার নেপথ্যের কারন হচ্ছে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা স্বরূপ মানে আমরা যে এতোদিন ধরে এক বিশ্বব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছি তা যে অনেক দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং নানান রকম অসঙ্গতি রয়েছে তা জানা, উপলদ্ধি এবং অনুধাবন করার জন্য বর্তমানের ঠিক এসময়টাতে  মডার্নিজমের ইতিহাস এবং দার্শনিক বোঝপড়াটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বিশ্বব্যবস্থায় যে নানান ত্রুটি পরিলক্ষিত হওয়ার কথা তা আড়াল হয়ে পড়বে। করোনা প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট হোক উপরোক্ত আলোচনার ফ্রেমে আবদ্ধ করা ছাড়া উপায়ান্তর নেই!

মডার্নিজম আমাদের সামনে ব্যক্তিবাদ জাতীয়তাবাদ, এনলাইটেনমেন্ট, ভোগবাদ, ধর্মনিরেপক্ষতা,পুঁজিবাদ এবং যুক্তিবাদের ধারনা হাজির করে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে ঠিকই কিন্তু বিদ্যমান এই ব্যবস্থায় নানান রকমের শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ স্যার এর একটি পর্যবেক্ষন খুবই প্রাসঙ্গিক।" তিনি দেখিয়েছেন বিশ্বব্যবস্থার এই ত্রুটিগুলির একটি মাত্রা হলো রাষ্ট্রগুলি তার সীমানা কেন্দ্রিক তথা রাষ্ট্রভিত্তিকভাবে বিবেচনা করে, অথচ মানুষের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ ছিল"।

এক্ষেত্রে রাষ্ট্র মূলত তার মুনাফার কথা ভাবে, একান্তভাবে তার সীমান্তরক্ষার কথা ভেবে বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরত্বারোপ করেনা।এটাকে আপনি জাতীয়তাবাদের ফ্রেমে আবদ্ধ করতে পারেন। অথচ সকলের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত না করলে যে আমার স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়না করোনা সাহিত্য তা আমাদের সামনে হাজির করেছেন।জাতীয়তাবাদী চিন্তায় বিভোর ডোনাল্ড ট্রাম্প সহ উগ্র ডানপন্থী নেতারা পরিবেশের উন্নয়নকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে কুন্ঠিতবোধ হয়না। অথচ ১৬ -১৭ বছরের মেয়ে গ্রেটাথুনবার্গ অনুধাবন করতে পারলো বর্তমান পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হলে পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ!

সামরিক খাতে কোটি কোটি টাকা খরচ করা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা মাস্ক আর মেডিকেল পোশাকের অভাবে আজ অসহায়। বাজার অর্থনীতিতে আচ্ছন্ন বস্তুবাদী পশ্চিমা সভ্যতা মানুষ মারার প্রযুক্তি বানাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে আজ মানুষের জীবন বাঁচাতে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। "ওয়ার এগেইনস্ট টেরর" নামে পুরো পৃথিবীতে হাজার হাজার মুসলমানক হত্যা এবং বিলিয়ন ডলার টাকা ব্যয় করে পশ্চিমারা আজ ক্লান্ত! আমেরিকার পারমানবিক রণতরী রুজভেল্ট কতোটা শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে!

কোথায় আজ বিশ্বের পরাশক্তিগুলির পারমানবিক অস্ত্র,ট্যাংক, ক্ষেপনাস্ত্র,যুদ্ধ বিমান আর কামান।

ক্ষুদ্র এই অনুজীবের কাছে বড্ড অসহায় এগুলো এবং এক প্রকার বোবার চরিত্র প্রদর্শন করছে! বিশ্ব কোন দিকে এসেছে আর "আই উইল মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন" এবং "আমেরিকা ফার্স্ট নীতি"বলে আমেরিকা কোন পথে হাঁটতেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এরকম একাট্টা লোকের কাছ থেকে পর্যন্ত নিম্নোক্ত অসহায়ত্বের বানী শুনতে হয়।" আপনারা আমাকে ২২ লক্ষ মানুষ মারা যাবার কথা বলছেন,তবে সংখ্যাটি যদি ১-২ লাখের মধ্যে থাকে, আমি বলবো সেটা আমাদের সাফল্য"। নাকের ডগায় যখন বিপদ আসন্ন তখন ট্রাম্প বলছেন, "এই মুহূর্তে প্রথমত,জীবন বাঁচানো আর দ্বিতীয়ত আমাদের অর্থনীতি আগের মতো শক্তিশালী করে তোলা"। সবচেয়ে পুঁজিপতি রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা এই ক্ষেত্রে উদহারণ মাত্র।

বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদকে চাঙ্গা রাখার জন্য তথাকথিত উন্নয়নের বুলি আউড়িয়ে প্রতিনিয়ত আমরা পৃথিবীব্যাপী পরিবেশে ও প্রকৃতিকে বিনষ্ট করছি। বিশ্বায়নকে গড়ে তুলেছি পুঁজি এবং মুনাফার স্বার্থে।

বিশ্বায়নে এই যুগে মানুষ, মানবিকতা, স্বাস্থ্যের জায়গা হয়নি তা করোনা সাহিত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত করলো।আমরা ভুলেই গিয়েছি মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান খুবই জরুরী। ফলে আজকের করোনার মতো অনুজীবরা বসবাসের জায়গা হিসেবে মানুষের দেহকে বেছে নিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে  শ্রদ্ধেয় আলতাফ পারভেজ স্যার বলেছেন, "বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশকে আগ্রাহ্য করে কেবল পুঁজির স্বার্থ দেখার দীর্ঘ ঐতিহ্য এবার কেবল নৈতিকভাবেই নয়, কার্যকরিতার দিক থেকেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি বিশ্বের এই ক্রান্তিকালীন সময়ে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খোলার আহবান এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো তা অমানবিক। আসলে পু্ঁজি মুনাফা ছাড়া কিছু বুঝেনা। বেঁচে থাকারর জন্য মানুষের যে পরিবেশটা দরকার সে পরিবেশকেও পুঁজি কিংবা পুঁজিপতিরা রিসোর্স এবং পন্য হিসেবে বিবেচনা করে। আর সেখানেতো শ্রমিকরা দুই পয়সার মানুষ! পুঁজিপতি লোকেরা একই ভাবে মুনাফাকেন্দ্রিক চিন্তায় আচ্ছন্ন যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিক ও তাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় আসেনা।পুঁজিবাদের গোলকায়নে তাদের বাস। যদিও বাংলাদেশ সেই অর্থে বিকশিত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র নয়! পুঁজিবাদের অবশ্যই ইতিবাচক দিক আছে কিন্তু বিশ্বে পুঁজিবাদের নাম করে পুরো পৃথিবীকে যে অমানবিক করে ফেলেছে তার সমালোচনা করাটা জরুরী হয়ে পড়েছে।

করোনার এই সময়ে রাষ্ট্রগুলি এক ধরনের কর্তৃত্ববাদীর রূপ নিচ্ছে যেমনটা আমরা চীনেও অবলোকন করেছি।প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র ঠিক করে দিচ্ছে নাগরিকদের কি করতে হবে, মৌলিক অধিকারগুলির ওপর হস্তক্ষেপ করছে সর্বোপরি নাগরিকদের এক ধরনের নজরদারির শৃঙ্খলে বন্দি করে ফেলছে। চারদেয়ালে আবদ্ধ করে ফেলছে মানুষের জীবন। দার্শনিক মিশেল ফুকো তাঁর ক্ষমতা তত্বে বলেছিলেন রাষ্ট্র মূলত নাগরিকের নিরাপত্তা এবং কল্যানের নাম করে নাগরিকদের ওপর এক ধরনের নজরদারি (প্যান অপটিকন) অব্যাহত রাখে। কার্যত রাষ্ট্র আসলে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তার এই এক্টিভিটিস চলমান রাখে। বর্তমানে করোনা অধ্যায় তার অন্যতম উদহারণ।

অগত্যা রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নের সম্মুখীন হবে! কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই এই পরিস্থিতি তৈরীর প্রভাবক। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষরা সাধারনত রাষ্ট্রের বিপক্ষে।সমাজতন্ত্রের রাজনীতি মানে রাষ্ট্র বিলোপের রাজনীতি। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাড়াও নানান তাত্ত্বিকগন রাষ্ট্রের বিপক্ষে গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। কার্ল মার্ক্সের শিষ্য ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব ( State and Revolution) বইয়ে বলেছেন রাষ্ট্র মূলত বল প্রয়োগের হাতিয়ার যেখানে রাষ্ট্র অধিপতি শ্রেনীর পক্ষ নিয়ে নিপীড়িত শ্রেনীকে দমন করে। খোদ আমাদের ইসলাম ধর্মেও রাষ্ট্রের ধারনা নেই। রাষ্ট্রকে সামনে আনলে মুসলিম উম্মাহর ধারনা আর টিকেনা!

আধুনিকতাবাদের নাম করে আমরা যে বিশ্বভ্রম্মান্ডে এক বস্তুবাদী এবং মানব রচিত পৃথিবীর এক  চিন্তাকাঠামোর জগত বানিয়েছি আসলেই কি আমাদের সমাধান দিতে পারছে?মানুষ,প্রকৃতি এবং পরিবেশের আদৌ কি মুক্তি ঘটেছে? যদি হয়েই থাকে তাহলে করোনার ভয়াবহ অবস্থার নিরিখে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? "We lost control of the epidemic. We died physically and mentally, we don’t know what to do anymore. All solution on earth have ended. The only solution is to the sky" (মহামারীর উপর আমরা আমাদের সকল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি। আমরা শারীরিক এবং মানসিকভাবে মারা গিয়েছি, আমরা জানিনা আমাদের আর কি করতে হবে, পৃথিবীর সমস্ত সমাধান যেন শেষ হয়েছে। শুধু একমাত্র সমাধান হচ্ছে ঐ আকাশের দিকে "(ঐশ্বরিক)।

করোনা অধ্যায় উপরোক্ত আধুনিকতাবাদ এবং বিশ্বব্যবস্থার নানান অসঙ্গতি এবং ত্রুটিগুলিকে  আমাদের সামনে উদোম করে ছেড়ে দিয়েছে।ফুকো,দেরিদা, গ্রামসী এই পোস্ট মডার্নিস্ট থিঙ্কাররা আমাদের সামনে মডার্নিজমের ক্রিটিক নিয়ে হাজির হচ্ছে কিন্তু আদত সমাধান কি পাচ্ছি? দেরিদার ডিকন্সট্রাকশন থিওরির কেন্দ্র এবং প্রান্তের নিরিখে পোস্ট মডার্নিজম হচ্ছে মডার্নিজমেরই এক চলমান প্রক্রিয়া। তারপরও চারদিকে সহিংসতা,যুদ্ধ,সন্ত্রাসবাদ, উগ্রতা, জাতীয়তাবাদ এবং পুঁজিবাদের ছোবল!

তাই অদৃশ্যমান এই ক্ষুদ্র অনুজীবটি আমাদের বার্তা দিয়ে যাচ্ছে তোমরা যে বিশ্বকাঠামো গড়ে তুলেছো তা দিয়ে আমাকে কাবু করতে পারবেনা বরং ভবিষ্যতে বহু নতুন রূপ ধারন করে এ ধরনীতে আবির্ভূত হবো। তোমাদের এ কাঠামো  আমাদের পরিবেশকে ধ্বংস করেছো, আমাদের বাসস্থানকে ধ্বংস করেছো। মানবের শরীর ব্যতীত আমাদের আর কোনো উপায়ন্তর নেই। বস্তুবাদী এই আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা মানুষ, প্রকৃতি এবং পরিবেশের উন্নয়ন ব্যতিরেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ক্ষুধার্ত মুনাফাকেন্দ্রিক এক পৃথিবী বানিয়েছে। অথচ আধুনিকতাবাদ ( Modernism) এবং আলোকায়নের  (Enlightenment) নামে পৃথিবীকে যে সুখের স্বর্গ বানানোর কথা তা আজ এক খন্ড নরকে পরিণত হয়েছে। করোনা প্রাকৃতিক কিংবা মনুষ্য সৃষ্ট জীবানু অস্ত্র হোক উপরোক্ত আলোচনা উভয়ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক।

জ্ঞানে- বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, ক্ষমতায়, অর্থে, বিত্তে এবং সম্পদে বলীয়ান হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর মানুষ ক্ষুদ্র এই ভাইরাসের কাছে কতোটা অসহায়, নির্বাক ও  কিংকর্তব্যবিমূঢ়।তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাববার! বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা এবং আধুনিকতার ইতিহাস ও দার্শনিক বোঝাপড়া এবং মীমাংসা কিংবা সমাধান করবার। সময় এসেছে আমরা যে এক প্রকার অসুস্থ হাইব্রিড পৃথিবী বানিয়েছি যেখানে মানুষের প্রকৃতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, মানুষের নিরাপত্তা কিংবা মানবিকতার মূল্য নেই সেখানে আছে যুদ্ধ, ক্ষমতার লড়াই, বৈষম্যেরর ছড়াছড়ি, ক্রোধ, হিংসা, মুনাফা, জুলুম, শোষণ, সন্ত্রাসবাদ, উগ্রতা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের লড়াই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার।

আজকের লড়াই তাই আবারো সমাজের অভিমুখে মানুষের ফেরার লড়াই। সত্য সন্ধ্যানের লড়াই!

অন্য মানুষের সাথে প্রকৃতির সাথে সমাজের মাধ্যমে সচেতন সম্পর্ক স্থাপনের লড়াই। তাহলেই প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের সহবস্থানের মাধ্যমে সুন্দর এক মানবিক পৃথিবী বিনির্মাণ সম্ভবপর বলে মনে করি অন্যথায় বিজ্ঞান করোনা সমস্যা সমাধানের পরেও আমরা পুনরায় করোনার মতো করে অসুস্থ এক পৃথিবীর সম্মুখীন হবো। আমরা এর জন্য প্রস্তুত তো? কোন দিকে হবে আমাদের গন্তব্য? সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নেবার এখনই উপযুক্ত সময়!

লেখক : মোঃ শাহ জালাল
শিক্ষার্থী, চতুর্থ বর্ষ
অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দেশসংবাদ/প্রতিনিধি/এনকে


আরও সংবাদ   বিষয়:  করোনাভাইরাস   মোঃ শাহ জালাল  




আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা আপডেট
ভাইস প্রেসিডেন্টসহ করোনায় আক্রান্ত ১০ মন্ত্রী
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft
logo
up