ঢাকা, বাংলাদেশ || শনিবার, ৩০ মে ২০২০ || ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ লিবিয়ায় গুলিতে নিহত ৫ জন ভৈরবের ■ চার্টার্ড প্লেনে সস্ত্রীক লন্ডন গেলেন মোরশেদ খান ■ ভারতে ৪ দশমিক ৬ ভূমিকম্পের আঘাত ■ বহিষ্কারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জের ঘোষণা দিলেন মাহাথির ■ দেশে নতুন করে গরিব হলো ২৩ শতাংশ মানুষ ■ হাইকোর্টে স্থায়ী হলেন ১৮ বিচারপতি ■ সোমবার থেকে বাস চলবে, খালি রাখতে হবে অর্ধেক আসন ■ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি বাড়ল ১৫ জুন পর্যন্ত ■ বাংলাদেশে চাকরির সার্কুলার কমেছে ৮৭ শতাংশ ■ লিবিয়ার ঘটনায় হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় মিলেছে ■ আমের মৌসুম শুরু হলেও জমেনি কেনা-বেচা ■ ১০ দিনে ২১ হাজার আসামির জামিন
করোনা-কালের দিনলিপি
তবে কী তারা আমায় ডাকে!
কাজী এস. ফরিদ
Published : Monday, 27 April, 2020 at 9:42 PM, Update: 27.04.2020 10:44:15 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

কাজী এস. ফরিদ

কাজী এস. ফরিদ

সকালে অদ্ভূত ডাকাডাকির (পড়ুন কিচিরমিচির) শব্দে ঘুম ভাঙল। বেডরুমের দরজা খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখি কয়েকটা ঘুঘু একদম ব্যালকনির দরজার সামনে এসে ডাকছে। মুহূর্তের মধ্যে আমার মনে হল, তারা বুঝি আমাকেই ডাকছে। বুঝলাম তাদের ক্ষুধা পেয়েছে, আমার কাছে খাওয়া চাচ্ছে তারা। সপ্তাহখানেক থেকে তাদেরকে খাওয়া দিচ্ছি। কিন্তু এতটা কাছে তারা আর কখনো আসেনি। তাড়াতাড়ি করে কিছু চাল দিলাম। তারা আপন মনে খেতে শুরু করল। কিছুক্ষনের মধ্যে এই কয়েক দিনের পরিচিত কয়েকটা শালিক, ফিঙে, বুলবুলি, চড়ুই এসে জুটল। আমি খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে কিছু পাউরুটি ছিড়ে দিলাম। আজ মনে হল আমাকে তারা আর তেমন একটা ভয় পাচ্ছে না। এতদিন দেখে আসছি, দূর থেকে চাল-রুটি ছুড়ে মারলেও তারা ভয় পেয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে। যদিও একটু পরেই আবার ফিরে আসত। আজ তাদের মধ্যে ভয় পেয়ে উড়ে যাওয়ার ভাব তেমন একটা দেখা গেল না।

ক্যাম্পাসে লকডাউন কঠোর হওয়ার পর একদিন দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে আমার নিচ তলা বাসার ব্যালকনির বাইরে কয়েকটা চড়ুই ইতস্তত উড়ে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হল তারা খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই তাদেরকে কিছু চাল খেতে দিলাম। কিছুক্ষন পরে দূর থেকে দেখি তারা খুটে খুটে চাল খাচ্ছে, সাথে কয়েকটা ঘুঘু জুটেছে। দুই-একদিন পরে তাদের সাথে যোগ দিয়েছে কয়েকটা শালিক, বুলবুলি, ও ফিঙে। আরো দুই-একটা নাম না জানা পাখিও আসে। সেই থেকে তারা আমার সকাল বেলার নিয়মিত অতিথি এবং আমার বর্তমান করোনাকালীন সময়ের একটা অংশ হয়ে গেছে। কোন দিন তাদের আসতে একটু দেরি হলে আমার কেমন যেন লাগে!

মাঝে মাঝে তারা দুপুরে কিংবা বিকেলেও আসে। একদিন দুপুরে তদেরকে চাল খেতে দিয়েছি। হঠাৎ দেখি দুইটা বড় বড় কাক এসে জুটল। কাক দুটোর ভয়ে শালিক-ঘুঘু-ফিঙে-চড়ুই পালিয়ে গিয়ে আশেপাশের গাছে আশ্রয় নিয়ে চিৎকার শুরু করল। যেন তারা কাক দুটোর বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ করছে! কাকগুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তারা গেল না। বড় বড় ঠোঁট দিয়ে কেমন করে যেন খুটে খুটে চাল খাচ্ছে। আমি তাদেরকে পাউরুটি দিলাম, তারা পাউরুটি খেয়ে চলে গেল। এরপর আমার নিয়মিত অতিথিরা গাছ থেকে নেমে এসে চাল খেল। কাকগুলো অবশ্য পরে আর একবারও আসেনি। কী জানি কেন আসেনি! তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম বলে হয়ত তারা আমার উপর অভিমান করেছে।

এই কয়েক দিনের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারলাম, ঘুঘুরা মানুষকে বেশি বিশ্বাস করে। এই কারনে তারা আমাকে দেখা মাত্রই ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় না। সেই তুলনায় শালিকরা বড় বেশি অবিশ্বাসী-সন্দেহপ্রবণ-ভীতু। দূর থেকে পাউরুটি ছুড়ে দিলেও তারা ভয়ে উড়ে গিয়ে গাছে বসে। পরে অনেক দূরে নেমে, ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে লম্বা-চিকন পা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এসে এক টুকরো রুটি নিয়ে আবার দ্রুত উড়াল দেয়। তাছাড়া শালিকরা মনে হয় কিছুটা স্বার্থপর ও লোভী। একটাকে একদিন দেখলাম খুব দ্রুত কয়েক টুকরো রুটি একসাথে মুখে নিয়ে পরে গাছে বসে আসতে আসতে খাচ্ছে। আর ফিঙে-বুলবুলি-চড়ুইকে কিছুটা সাহসীই বলা যায়। কাককে তো ধমক দিলেও যেতে চায়নি।

শালিক ও ঘুঘু

শালিক ও ঘুঘু

খাদ্যাভ্যাসের কথা যদি বলি (শুধুমাত্র আমার সরবরাহকৃত খাবারের প্রেক্ষিতে) তাহলে বলতে হয়, চড়ুই বাবু চাল পেলেই খুব খুশি, রুটির দিকে ফিরে ও তাকায় না। শালিক রুটি পছন্দ করে, তবে চালকে ও না করে না। ঘুঘু আকারে বড় হলেও পাউরুটি খেতে মনে হয় কিছুটা কষ্ট হয়। তাই তারা চালই পছন্দ করে। তাদের আপন মনে খুটে খুটে চাল খাওয়াটা দেখার মত। আর বুলবুলি-ফিঙে ঘুঘুর থেকে আকারে ছোট হলেও পাউরুটি ভালোই খেতে পারে। পাউরুটি দিলে মনে হয় চালে তাদের ভীষণ অরুচি। ইদানিং আমি তাদেরকে ভাতও দিচ্ছি। নরম হওয়ার কারনে ভাত খাওয়া একটু সহজ বিধায়, মনে হচ্ছে তারা সবাই ভাত পছন্দ করছে।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না। তা হচ্ছে, এই লেখার খসড়া যেদিন তৈরি করি তার পর দিন থেকে একটা অদ্ভূত ঘটনা ঘটেছে। আমার কাছে আমার অতিথিদের (পড়ুন পাখিদের) আসা কিছুটা অনিয়মিত হয়ে গেছে। তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লংঘন করেছি বলে তারা হয়ত আমার উপর রাগ করেছে। তারা হয়ত ভেবেছে, তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে আমি সাহিত্য রচনা করছি। এই অভিমানে হয়ত তারা আমার উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

তারা হয়ত মনে মনে বলছে, “তোমরা মানুষরা যেকোন অবস্থায় তোমাদের ব্যবসায়িক ধান্দাবাজি ছাড়তে পার না। দুই টাকার চাল-রুটি খাইয়ে দশ টাকার ক্রেডিট নিচ্ছ, গদ্য রচনা করছ, নাম কামানোর চেষ্টা করছ। জীবিকার তাগিদে আমরা তোমার দুয়ারে এসেছি, আর তুমি সেটা প্রকাশ করে দিয়েছ, সেটার আবার ছবি তুলছ। তোমরা আর মানুষ হলে না, ধান্দাবাজই রয়ে গেলে! ঘরের ভিতর ঢুকে গিয়েছ, তাও তোমাদের বোধোদয় হচ্ছে না! এখনও তোমরা স্বার্থপর-দলকানা-অহংকারী-ঠগবাজ-চাটুকার রয়ে গেলে। তোমরা কবে মানুষ হবে? কবে স্বার্থপরতার শিকল ভেঙে নিঃস্বার্থে কিছু করবে? কবে 'আপামর জনগণ' আর তোমাদের মত তথাকথিত 'উপর তলার মানুষ'দের মধ্যে যে বৈষম্যের দেয়াল গড়ে তুলেছ, তা ভেঙে দিয়ে প্রকৃত মানুষ হবে? আপামর জনগণও যে তোমাদের মত মানুষ, তাদেরও যে জীবনের মূল্য আছে, কবে তোমরা তা বুঝবে? কবে তোমরা গার্মেন্টসে পশুর মত ‘মানুষ পালা’ বন্ধ করে তাদেরকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিবে? কবে তোমরা সবার জীবনের সমান মূল্য দিবে? কবে সবার জন্যে বাসযোগ্য-বৈষম্যহীন একটা সমাজ গড়বে?'। তবে আমার জন্যে আশাব্যঞ্জক যে ঘটনা ঘটেছে তা হচ্ছে, এই লেখা চূড়ান্ত করতে করতে আমার অতিথিরা আমার কাছে আবার ফিরে এসেছে। তারা হয়ত আমাকে বুঝতে পেরেছে!

যা হোক,এই পাখিগুলো এখন কী সুন্দর মনের আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে, যদিও তারা কিছুটা খাবারের সমস্যায় আছে। তাই এই সময়ে মানুষের পাশাপাশি আমাদের পশু-পাখির দিকেও একটু খেয়াল রাখা প্রয়োজন। কিছু দিন আগেও মানুষের অত্যাচারে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয়েছে। আমরা মানুষরা নির্বিচারে বন জঙ্গল কেটে উজাড় করে তাদের আবাসস্থল ধ্বংস করছি। পৃথিবীর সব সংকটের মূলেই আছে আমাদের সীমাহীন লোভ। আমাদের প্রয়োজনে প্রকৃতিকে আমরা নিঃশ্বেষ করে ফেলছি। আমরা আমাজন ধ্বংস করছি, সুন্দরবন ধ্বংস করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাচ্ছি, পাহাড় কেটে রাস্তা বানাচ্ছি, কারখানার বর্জ্য অবাধে নদীতে ফেলছি, নদী-খেকোরা নদী গুলোকে মেরে ফেলছি। প্রকৃতি-বিনাশী কত কিই না করছি আমরা। আমাদের নিত্য-নতুন চাহিদা মেটানোর জন্যে প্রকৃতিকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছি। করোনার এই দুর্যোগ হয়ত একদিন শেষ হবে। তখন প্রকৃতি ও মানুষের ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আমরা মানুষরা সচেষ্ট হব, করোনাকালে এটাই প্রত্যাশা করছি।

লেখক: কাজী এস. ফরিদ
সহযোগী অধ্যাপক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
email: [email protected]


দেশসংবাদ/কেএসএফ/এফএইচ/mmh


আরও সংবাদ   বিষয়:  ঘুঘু   কিচিরমিচির  




আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা আপডেট
ইউনাইটেডে আগুনে পুড়ে ৫ করোনা রোগীর মৃত্যু
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft
logo
up