ঢাকা, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০ || ৩০ আষাঢ় ১৪২৭
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ চট্টগ্রামে করোনায় এবার নারী চিকিৎসকের মৃত্যু ■ আগস্টেই বাজারে মিলবে করোনার ভ্যাকসিন! ■ এক লাখ আধুনিক দাসত্বের দেশ ব্রিটেন ■ সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ আর নেই ■ যুক্তরাষ্ট্রে করোনা তাণ্ডবের কারণ জানালেন ড. ফাউসি ■ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মন্ত্রণালয়ের অন্য কোনো সমস্যা নেই ■ করোনায় সুস্থ রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়াল ■ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৩১৬৩, মৃত্যু ৩৩ ■ ভারতে আক্রান্ত ৯ লাখ ছাড়াল ■ করোনায় বিশ্বজুড়ে ৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু ■ ডা. সাবরিনার মামলা তদন্তের দায়িত্বে ডিবি ■ ভারতে ২৪ ঘণ্টায় ৫৫৩ মৃত্যু
করোনা’র কুমির-থেরাপি
প্রফেসর ড. মো: পারভেজ আনোয়ার
Published : Wednesday, 27 May, 2020 at 9:26 PM, Update: 27.05.2020 10:24:00 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

প্রফেসর ড. মো: পারভেজ আনোয়ার

প্রফেসর ড. মো: পারভেজ আনোয়ার

বনের মাঝ দিয়ে উত্তর দক্ষিণে বয়ে যাওয়া নদীটি বনটিকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করেছে। বনের পশ্চিম পাশে দশ সহস্রাধিক বিভিন্ন পশুর বাস, পর্যাপ্ত ঘাস আর ঝোপ-জঙ্গল থাকায় পশুদের খাবারের কোনো অভাব নেই। কাজেই বেশ সুখেই দিন কাটছিলো তাদের। হঠাৎ করেই এক অজানা রোগে ঝোপ-জঙ্গল সব মরে যেতে শুরু করলো, দেখা দিতে শুরু করলো খাদ্যাভাব। প্রথম দিকে সবাই বিষয়টাকে ততটা গুরুত্ব দিলোনা, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই যখন খাদ্যসংকট তীব্রভাবে দেখা দিলো তখনই সবার টনক নড়লো। সবাই মিলে জরুরি আলোচনায় বসলো করণীয় ঠিক করার জন্য; নানাজনের নানা মত, সিদ্ধান্ত কি আর এতো সহজেই আসে? বেশ কয়েকবার আলোচনায় বসলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সবাই একমত হতে পারলোনা। এদিকে সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে খাদ্য সংকট ততই তীব্র হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু শাবক আর বয়স্ক পশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও খাদ্য নিয়ে পশুরা নিজেদের মধ্যে বিবাদেও জড়িয়ে পড়ছে, যা আগে কখনোই ঘটেনি। খাদ্যাভাবে এবং রোগাক্রান্ত ঘাস-লতা খেয়ে বেশ কিছু পশু'র মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে শোনা গেলেও রাজসভা সেটাকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মতে এগুলি বার্ধক্য জনিত/ স্বাভাবিক মৃত্যু।

অবশেষে পশুদের রাজা তার সভাসদদের নিয়ে জরুরি সভা ডাকলেন করণীয় ঠিক করার জন্য। সভার সর্বসম্মত সিদ্ধন্তে কৃষি-খাদ্য, স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি কমিটি করা হলো, যাদের দায়িত্ব হবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে একটি সুপারিশ পেশ করা। কমিটি বিশদ আলোচনান্তে একটি বিষয়ে একমত হলো যে, আমরা যদি বনের পশ্চিম পাশে থেকে যাই তবে সবাইকেই অনাহারে মারা যেতে হবে, কাজেই সমাধান একটাই সেটা হলো নদী পার হয়ে বনের ওপর পাশে চলে যাওয়া যেখানে অফুরন্ত ঝোপ-ঝাড় আর ঘাসবন, খাবারের কোনো অভাব নেই। কিন্তু সমস্যা একটাই আর সেটা হলো নদীটিতে কুমিরের আনাগোনা প্রচুর। কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত এবং নদী পারাপারের ঝুঁকির কথা রাজাকে বিস্তারিত জানালেন। রাজামশাই পড়লেন গভীর দুশ্চিন্তায়, বনের ঐপাশে থাকলে সবাইকে মরতে হবে অনাহারে, আর পার হয়ে ওপারে যেতে চাইলে অনেককেই যেতে হবে কুমিরের পেটে। রাজামশাই ভাবলেন একা সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবেনা, তাই কমিটির সিদ্ধান্ত পুনরায় অধিকতর আলোচনার জন্য তুললেন মন্ত্রিসভায়। মন্ত্রিসভায় দিনব্যাপী আলোচনা শেষে সবাই দুর্যোগ মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিলেন বিষয়টি অধিকতর পর্যালোচনা করে ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট মন্ত্রিসভায় পেশ করার জন্য।

এদিকে প্রজাদের কথা চিন্তা করে রাজার ঘুম হারাম হবার জোগাড়। উনি জরুরি ভিত্তিতে কিছু ব্যবস্থা নেবার জন্য তার প্রশাসনকে নির্দেশ দিলেন। খাদ্য-কৃষি মন্ত্রণালয়কে বলা হলো খুব দ্রুত ঘাস-লতার মড়কের কারণ নির্ণয় এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা করার জন্য। একই সঙ্গে তাদের কে আরও নির্দেশ দেয়া হলো তারা যেন দ্রুত বিকল্প/অপ্রচলিত নিরাপদ খাদ্য খুঁজে বের করে, যেটা খেয়ে পশুরা এই দুর্যোগে অন্তত বেঁচে থাকতে পারে। খাদ্য-কৃষি মন্ত্রণালয় তাদের সীমিত সামর্থের মাধমে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো যেন পশুদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বলা হলো পশুদের অপুষ্টি আর রোগ বালাই এর দিকে বিশেষ নজর দেবার জন্য; কেউ যেন অপুষ্টি বা বিনা চিকিৎসায় মারা না যায় তা নিশ্চিত করতে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নতুল জনবল নিয়োগ এর মাধ্যম সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হলো পশুরা যেন ঘরে থাকে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের না হয় সেটা নিশ্চিত করতে; কেউ বের হলেও যেন অবশ্যই মুখে ঠুসি (mask) পরে বের হয়, এর ফলে বাইরের রোগাক্রান্ত ঘাস-লতা খেয়ে কারও অসুস্থ হবার সম্ভাবনা থাকবেনা। পশু প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে অনাক্রান্ত এলাকা থেকে ঘাস-লতা সংগ্রহ করে রেশনিং করে বাড়ি বাড়ি খাদ্য পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হলো।

কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব, অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি, সীমিত জনবল ও সম্পদ এবং সঠিক সমন্বয় এর অভাবে কোনো কিছুই পরিকল্পনা মতো বাস্তবায়িত হলোনা। রাজা নিজে দিন-রাত তদারকি করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেন না। পশুরা কেউ ঘরে থাকতে রাজি না; খাদ্যের খোঁজে এবং বিভিন্ন অজুহাতে তারা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আস্তে লাগলো ঠুসি ছাড়াই এবং রোগাক্রান্ত ঘাস-লতা খেয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লো, মৃত্যুর হার ও আগের চাইতে বেড়ে গেল। অসুস্থ পশুদের সামাল দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়লো; দায়িত্ব পালনরত কৃষি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মীরাও অতিরিক্ত কাজের চাপে দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলো। নিরাপত্তা বাহিনীও পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে একসময় হাল ছেড়ে দিলো, ফলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠলো। মৃত্যুর গুজব ডালপাতা মেলতে থাকায় রাজা একসময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিলেন প্রতিদিন রোগাক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বিষয়ে জনগণকে ব্রিফ করার জন্য। রাজসভা কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়েও জনগণকে নিয়মিত অবহিত করা হতে লাগলো যেন সবাই রাজার উপর আস্থা রাখতে পারেন। কিন্তু এই নিয়মিত ব্রিফিংও জগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বার্থ হলো, পশুরা আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে লাগলো। ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যা তাদেরকে আরো আতঙ্কিত করে তুললো।

এর মধ্যে এক বিজ্ঞানী পশু দাবি করলো যে, সে নতুন এক ঘাসের সন্ধান পেয়েছে যা রোগাক্রান্ত নয় এবং পশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর। সে ওই ঘাসটি দ্রুত চাষ করে খাদ্য সমস্যা সমাধানের জন্য জোর দাবি জানালো। সে আরো দাবি করলো যে ঘাসটির চাষ পদ্ধতি অত্যন্ত সহজ এবং সুলভে এটি উৎপাদন করা সম্ভব; আমাদের বনের পশুরা এটি না খেলেও অন্যান্য বনের পশুরা এই ঘাস খায় বিধায় এটি নিরাপদ। কিন্তু তার কোনো যুক্তিই রাজসভার মন ভিজতে পারলো না; রাজসভা জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া ওই নতুন আবিষ্কৃত ঘাস চাষের অনুমতি দিতে রাজি হলোনা এবং পশুদেরকেও ওই ঘাস খেতে বারণ করলো। একটি কমিটি করে দেয়া হলো যারা ওই ঘাসটি আদৌ খাবার উপযোগী কিনা তা পরীক্ষা করে রিপোর্ট করবেন। তাদের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে সে ঘাসটি অনুমোদন দেয়া হতে পারে। ফলে এই দুর্যোগের মুহূর্তে শেষ আশা টুকুও দীর্ঘসূত্রিতার জালে আটক পড়লো।

এদিকে রাজার সিদ্ধান্তহীনতায় এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে পশুদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়ে চললো। পশুরা বিভিন্ন উপদলে ভাগ হয়ে পড়লো।  একদলের মতে, (যারা বিশেষ করে বয়স্ক) মরি আর বাঁচি নদীর এই পারেই থাকা উচিত; কারণ কুমিরের কারণে নদী পার হবার ঝুঁকি তো আছেই, সে সঙ্গে রয়েছে নদীর ওপর পারে খাবার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা। অপর দলের মতে, (যারা তুলনামূলক ভাবে তরুণ) এই পাশে অনাহারে মরার চাইতে অনতিবিলম্বে ঝুঁকি নিয়ে নদীর ওপারে চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নদীতে কুমিরের উপস্থিতি নিয়েও তারা সন্দিহান। অন্য দিকে আর এক পক্ষের মতে তাড়াহুড়ো না করে আর কিছুদিন অপেক্ষা করে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। ইতিমধ্যেই অতিউৎসাহী বেশ কিছু তরুণ পশু রাজার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই নদী পার হয়ে বনের ওপর পাশে যাবার চেষ্টা করে। নদী পার হতে গিয়ে অনেকেই কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়; কেউ কেউ আহত অবস্থায় এই পারে ফিরে আসে, কিন্তু বাকিদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়না। নিখোঁজদের বিষয়েও বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কারও কারও মতে নিখোঁজ পশুরা কুমিরের পেটে চলে গেছে, আবার অনেকের মতে নিখোঁজ পশুরা নিরাপদে নদীর ওপারে পৌঁছে গেছে; অনেকে নদীর ওপারে পশুদেরকে ঘুরতে দেখেছে বলেও দাবি করে।

ইতিমধ্যে মরার উপর খাড়ার ঘা'র মত পশু প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে আসতে শুরু করলো ঘাস আত্মসাৎ এবং ঘাস বিতরণে অনিয়মের খবর। গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে অনেক গন্যমান্য পশু ও রাজসভার অনেকেই আক্রান্ত ঘাস খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এমন সময় দুর্যোগ মন্ত্রী রাজার কাছে জমা দিলেন তার বহুল কাঙ্খিত রিপোর্ট। রিপোর্টে অনতিবিলম্বে নদী পার হয়ে সবাইকে ওপারে চলে যাবার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের জরিপ অনুযায়ী নদীতে আনুমানিক শ'দুয়েক কুমির আছে। দশ হাজার পশু যদি একত্রে নদীতে নেমে যায় তবে সকল কুমির ভয় পেয়ে আক্রমণ না করে পালিয়ে যেতে পারে। অথবা তারা যদি আক্রমণ করেও তবুও হতাহতের সংখ্যা দুইশতের অধিক হবেনা, শতকরা হিসাবে যা মাত্র ২%; কাজেই বৃহত্তর স্বার্থে ঝুঁকি নিয়ে সবাই একইসঙ্গে নদী পার হয়ে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো সমাধান। আরো সুপারিশ করা হয় যে, বাড়তি নিরাপত্তা হিসাবে নিরাপত্তা বাহিনী যদি সশস্ত্র অবস্থায় সকল পশুকে ঘিরে রাখে সেক্ষেত্রে হতাহতের পরিমান আরো কমানো সম্ভব। রাজসভায় বিশদ আলোচনানন্তে সর্বসম্মতিক্রমে সবাই একসঙ্গে নদী পার হবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আপত্তির মুখে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে নদী পার হবার সময় হতাহত সকল নিরাপত্তা কর্মী/পরিবার পযাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাবে। এবং একইসঙ্গে অন্য যে কোনো হতাহত পশু/পরিবারও ক্ষতিপূরণ পাবে। উর্ধতন কর্মকর্তা ও রাজসভার সকল সদস্যদের জন্যও বিশেষ রাজভাতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত দ্রুত জনগণকে জানিয়ে দেয়া হয় এবং পরের দিন সকালে সবাইকে নদীর পাড়ে জমায়েত হবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।

পরের দিন সকালে রাজার সিদ্ধান্তে সকলে মিলে একসঙ্গে নদীতে নেমে পড়ে। দলের কেন্দ্রে থাকেন রাজসভার সদস্যগণ, পশুপ্রতিনিধি এবং গন্যমান্য পশুবর্গ; তাদেরকে ঘিরে রাখে সাধারণ পশুরা। আর সবাইকে ঘিরে রাখলো সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী।  কুমিরকে ভয় দেখানোর জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে চললো কেউ কেউ। কিছুক্ষন সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চললো, কিন্তু মাঝ নদীতে গিয়েই বাধলো বিপত্তি। কুমিরের দল আক্রমণ করে বসলো; অতর্কিত আক্রমণে নিরাপত্তা রক্ষীরা প্রাণভয়ে ছত্রভঙ্গে হয়ে গেল, আর সাধারণ পশু এবং কেন্দ্রে থাকা রাজা ও মন্ত্রীবর্গ সহ ভিআইপি পশুরা অরক্ষিত হয়ে পড়লো। কুমিরের আক্রমণে নদীর পানি লাল হয়ে গেল। প্রাণভয়ে সকল পশু দিকবিদিক ছোটাছুটি করে যে যার মতো নদী পার হয়ে ওপারে উঠলো। রাজাসহ অন্যান্য ভিআইপি গণও সাধারণ প্রজার মতোই কোনো প্রোটোকল ছাড়াই কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে নদীর ওপারে উঠলেন। পিছনে পড়ে রইলো অসংখ্য আহত পশুর আর্তনাদ আর নিহতদের নিথর দেহ, সেই সঙ্গে ক্ষুধার্থ কুমিরদের পৈশাচিক উল্লাস। কিছু মারাত্মক আহত পশুও কোন ভাবে কুমিরের আক্রমণ থেকে ছাড়া পেয়ে তীরে এসে উঠলো। আহতদের গোঙানি আর নিহতদের পরিবারের সদ্যদের কান্নায় নদীর তীর ভারী হয়ে উঠলো।

কিছুক্ষন পরেই রাজার নির্দেশে হতাহতদের তালিকা তৈরী করা হল। দেখা গেল নিহত পশুর সংখ্যা প্রায় দুইশত আর আহত অর্ধশত। নিরাপত্তা সদস্য সহ একজন মন্ত্রী এবং বেশ কয়েকজন ভিআইপি পশু ও হতে তালিকায় আছে। আহতদের জন্য দ্রুত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। রাজা তার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী সকলকে পদমর্যাদা অনুসারে তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ দিলেন এবং হতাহতদের জন্য সমবেদনা জানিয়ে তাদের সম্মানে প্রতিবছর এই বিশেষ দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের নির্দেশ দিলেন। নদীর এই পারে প্রচুর সবুজ ঘাস-লতা আর ঝোপ-জঙ্গল দেখে সবাই অত্যন্ত খুশি হলো, খাবার নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। শুধু হতাহতদের পরিবারবর্গ শোক কাটিয়ে উঠতে কিছুদিন সময় নিল। ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে আসলো এবং তারা ওপারের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে আবার সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলো।

উপরে বর্ণিত গল্পটি একটি প্রতীকী ঘটনা। এর সঙ্গে কি আমাদের বর্তমানের করোনা দুর্যোগের কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন? আপনি ঠিক ধরেছেন, করোনা মোকাবেলার সকল সম্ভাব্য সমাধানের সুযোগ হারিয়ে আমরা এখন কুমির ভর্তি মাঝ নদীতে, নদীর এপার (করোনা পূর্ববর্তী সময়) থেকে ওপারে (করোনা পরবর্তী সময়) যাবার জন্য। নদীর ওপারে যাওয়া ছাড়া ছাড়া আমাদের আসলে কোনো বিকল্পও নাই। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তোবা এই যাত্রায় প্রাণ হারাবেন (যেমনটা পশুরা প্রাণ দিয়েছে কুমিরের খাদ্য হয়ে), অনেকেই করোনা পসিটিভ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবেন এবং চিকিৎসায় সেরে উঠবেন (কুমিরের আক্রমণে আহত হয়ে সেরে উঠা পশুদের মত)। কিন্তু আমাদের অধিকাংশই (৯০-৯৫%) হয়তোবা করোনা কে জয় করবো বাকি ৫-১০% এর আত্মত্যাগের বিনিময়ে। আমরা তাদের আত্মত্যাগ কে যেন ভুলে না যাই। আর এই যাত্রায় বিভিন্ন পেশার যারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদেরকে রক্ষা করে চলছেন তাদের অবদানকেও যেন আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। একই সঙ্গে এই দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকি পরবর্তী দুর্যোগের; কারণ করোনাই শেষ নয়, দুর্যোগ আসতেই থাকবে একটার পর একটা।

লেখক : প্রফেসর ড. মো: পারভেজ আনোয়ার
কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]

দেশসংবাদ/এফএইচ/mmh


আরও সংবাদ   বিষয়:  করোনা  




আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা আপডেট
চট্টগ্রামে করোনায় এবার নারী চিকিৎসকের মৃত্যু
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
ফাতেমা হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft
logo
up