ঢাকা, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০ || ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ বোমা হামলায় পুলিশসহ নিহত ১৭ ■ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ১১৭০০, আক্রান্তে ৫ লাখ ■ আবারো বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে আমেরিকা ■ ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ২ ■ স্ক্র্যাপের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক, ২০ কনটেইনার জব্দ ■ মাধ্যমিকে লটারিতে ভর্তি ■ তিন রাষ্ট্রদূতকে যা বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ■ শিক্ষায় বিনিয়োগের বিকল্প নেই ■ কমলো স্বর্ণের দাম ■ নিভারের প্রভাব পড়বে না বাংলাদেশে ■ ঢাকায় পৌঁছালো ‘ধ্রুবতারা’ ■ আলোচনায় কানাডা’র বেগমপাড়া
কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী ট্রাম্প
আতাহার খান
Published : Monday, 19 October, 2020 at 10:01 AM, Update: 19.10.2020 12:25:32 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখন প্রায় পিঠের পেছনে এসে নিঃশ্বাস ফেলছে। সময় আছে হাতেগোনা আর মাত্র ক’দিন। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। ইতোমধ্যে এ নির্বাচন সামনে রেখে বেশক’টি প্রতিষ্ঠান জনমত জরিপের ফল প্রকাশ করেছে।

তাতে পরিষ্কার ব্যবধান রেখে এগিয়ে আছেন বাইডেন, আর তার পেছনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে দৌড়াচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক দু’দলেরই ব্যস্ততার মধ্যে পার হচ্ছে সময়।

তবু বিস্মিত হতে হয়, সাধারণ আমেরিকানরা রাগবি কিংবা বেসবল নিয়ে যতটা সময় ব্যয় করেন, তার এক-চতুর্থাংশও এ নির্বাচন নিয়ে ভাবেন না। তারা নির্বাচনে ভোটও দেন না। যে দল এসব নীরব ভোটারকে বেশি ভোটকেন্দ্রে টেনে আনতে পারবে, সে দলেরই জয়ের সম্ভাবনা থাকবে বেশি।

আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ দুটি অঙ্গ জনমত জরিপ আর টেলিভিশন বিতর্কমালা। নির্বাচনী বিশ্লেষকরা এ মুহূর্তে ভোট দেয়ার হার, জনমিশ্রণের অনুপাত, অতীতের ভোট দেয়ার গতিপ্রকৃতি এবং ভোটারদের পরিবর্তনশীল মনোভাব বিবেচনায় নিয়ে আটটি অঙ্গরাজ্যকে চিহ্নিত করেছেন মূল ব্যাটল গ্রাউন্ড হিসেবে। তারা মনে করছেন, এসব অঙ্গরাজ্যের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে প্রেসিডেন্টপ্রার্থীর জয়-পরাজয়।

অঙ্গরাজ্যগুলো হল- অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, মিশিগান, মিনেসোটা, নর্থ ক্যারোলাইন, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিন। ট্রাম্পকে রোখার জন্য ডেমোক্র্যাটরা এ আটটি অঙ্গরাজ্যে সবরকম শক্তি নিয়োগ করেছে। বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে স্থানীয় টিভি ও সংবাদপত্রগুলো। জনমত জরিপে আটটি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সাতটিতেই এগিয়ে আছেন জো বাইডেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী ভোটারদের মধ্যে জরিপে পিছিয়ে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ২০১৬ সালের যেসব প্রবীণ শ্বেতাঙ্গ ভোটারের আনুকূল্যে তার বিজয় সহজ হয়েছিল, তাদের মধ্যেও সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী পিছিয়ে রয়েছেন ট্রাম্প।

জনমত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ৭ থেকে ৯ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। সিএনবিসি-চেঞ্জ রিসার্চের জরিপে দেখানো হয়েছে, অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোলাইনা ও পেনসিলভানিয়ায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেনের অবস্থা ভালো। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এনবিসি ও টেলিমুন্দোরের জনমত জরিপেও দেখানো হয়, বাইডেন এগিয়ে রয়েছেন।

তার পক্ষে জনমত ৬২ শতাংশ, আর ট্রাম্পের পক্ষে ২৬ শতাংশ। টুগেদার নামক একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা যায়, নারীদের মধ্যে বাইডেন এগিয়ে আছেন ১১ পয়েন্টে, আর পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্প এগিয়ে আছেন ৭ পয়েন্টে। তবে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকার মানে বিজয় অবধারিত ভাবার কোনা কারণ নেই। বেশি জরুরি হল ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে এগিয়ে থাকা।

ট্রাম্পের জাতিগত বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে বিশালসংখ্যক হিস্পানিক জনগোষ্ঠী তার প্রতি ক্ষুব্ধ। এতে হিস্পানিক অধ্যুষিত এলাকায় ট্রাম্প পিছিয়ে পড়তে পারেন। কারণ এ হিস্পানিক ভোটাররাই বেশকিছু অঙ্গরাজ্যে সরাসরি জয়-পরাজয় নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।

ফ্লোরিডায় তাদের সংখ্যা আছে ২০ শতাংশ, টেক্সাসে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ, নেভাদায় ২৯ দশমিক ২ শতাংশ, অ্যারিজোনায় ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। এ লাতিনো ভোটাররাই এসব অঙ্গরাজ্যে তুরুপের তাস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। এ হিস্পানিক জনগোষ্ঠীকে চটিয়ে ট্রাম্প এখন অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন ইলেক্টোরাল ভোট নিয়ে নতুন একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, ইলেক্টোরাল কলেজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন বাইডেন। সিএনএন প্রতিবেদনে বলা হয়, বাইডেনের পকেটে নিশ্চিতভাবে ২০৩টি ইলেক্টোরাল ভোট রয়েছে। এর বাইরে আরও ৮৭টি ইলেক্টোরাল ভোট তার দিকে ঝুঁকে আছে। ফলে বাইডেনের ইলেক্টোরাল ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা ২৯০টি। এর বিপরীতে ট্রাম্পের অবস্থা বেশ নাজুক।

তার পকেটে আছে নিশ্চিতভাবে ১২৫ ইলেক্টোরাল ভোট। এর বাইরে আরও ৩৮টি ভোট যুক্ত হতে পারে। নানামুখী জরিপের ফলাফল নার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে বলেই এখন দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর কেউ-ই এ মুহূর্তে স্বস্তিতে নেই। দু’দলের নীতিনির্ধারকরা এখন গলদঘর্ম। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, ধর্ম, বর্ণ, জেন্ডার ও বয়সের ব্যবধানে কোন অংশের সমর্থন কোন দিকে, এসব চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা নির্বাচনী রণনীতি ঠিক করার কাজে পার করছেন ব্যস্ত সময়।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অপর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি হল টেলিভিশন বিতর্ক। ২৯ সেপ্টেম্বর ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে প্রথম টিভি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় টিভি বিতর্কটি (১৫ অক্টোবর) বাতিল হয়ে যায়। তৃতীয় বিতর্কটি হওয়ার তারিখ নির্ধারিত আছে ২২ অক্টোবর। এটি হওয়ার কথা ন্যাশভিলে।

২৯ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে প্রথম টিভি বিতর্কেই দুই প্রার্থী তীব্র বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। ট্রাম্প ও বাইডেন দু’জনের মধ্যে ঘটে তিক্ত বাক্যবিনিময়। বিতর্কে তারা পরস্পরকে ব্যক্তিগত আক্রমণ পর্যন্ত করেন। ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যকার এ বিতর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিশৃঙ্খল বিতর্ক বলে বর্ণনা করছেন অনেকে। ভদ্রলোক বলে পরিচিত বাইডেনকেও বলতে শোনা গেল- ‘উইল ইউ শাট আপ, ম্যান’।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী এ উক্তি না করলেই সম্ভবত ভালো করতেন। তিনি নিজেও বিষয়টি জানেন। প্রথম আসরে বাইডেন তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে শুরু থেকে শেষ অবধি ভালো অবস্থায় ছিলেন না। যুক্তি ও তথ্যের কিছুমাত্র পরোয়া না করে ট্রাম্প ক্রমাগত তাকে বিরক্ত করে গেছেন এবং পুরো সময়েই বাইডেন নিছক ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

বিতর্কসভা সঞ্চালনাকারী প্রবীণ সাংবাদিকও একসময়ে হাল ছেড়ে দেন। তবে বাইডেন কিছুক্ষণ তর্ক চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং একপর্যায়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন- ‘আপনি মুখ বন্ধ করবেন?’ বলা বাহুল্য, ট্রাম্পের মুখ বন্ধ হয়নি।

আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই বিতর্কসভায় যে কৌশল প্রয়োগ করেছেন, তার নেপথ্যে ছিল অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক করে তোলা। এক্ষেত্রে ট্রাম্প সত্যিই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মিথ্যা কথা, গালাগাল, কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত বা পরিচিতদের নিয়ে কুৎসা রটনা, অনৈতিক-অশালীনতার সবকিছু করা একমাত্র ট্রাম্পের পক্ষেই সম্ভব।

এখন থেকে চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেয় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। জনমত সমীক্ষার ফলাফল, প্রচার কৌশল ও নানা কারণে তৈরি হওয়া ধারণা পাল্টে দিয়ে ট্রাম্পের সে বিজয় অনেক মার্কিনি খোলা মনে মেনে নিতে পারেননি। নির্বাচনী ফলাফলে তার বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই শুরু হয়েছিল বিক্ষোভ। দাবানল আকারে তা ছড়িয়ে পড়ে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, লস অ্যাঞ্জেলেস, টেক্সাস, শিকাগো, বোস্টন, ন্যাশভিল, সান ফ্রান্সিসকো, ইলিনয়সহ ৩০টির মতো বড় শহরে।

ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দারা তো আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়- রাজধানী স্যাক্রামেন্টোতে সমবেত হয়ে তারা স্বাধীন হয়ে যাওয়ার দাবি পর্যন্ত তুলে ধরে।

বলা যায়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বিজয়ের বিরুদ্ধে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান শহর ছিল বিক্ষোভে উত্তাল। নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেয়ার যে সংস্কৃতি যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, বিশ্বে উদাহরণ হিসেবে যা অভিনন্দিত হতো, ট্রাম্পের বিজয়ের পর সেই সংস্কৃতি বিশাল এক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। কিন্তু কথা হল, ট্রাম্প কেন এ সহিংসতা উসকে দিয়েছিলেন? কেন এরকম অচল অবস্থা সৃষ্টি করলেন? তার উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?

৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালীন ট্রাম্প ইচ্ছা করেই উত্তেজনা তৈরি করেছিলেন। আক্রমণাত্মক বক্তৃতা-বিবৃতিতে অশ্বেতাঙ্গ-হিস্পানিক ও নারীদের শুধু আহত করেননি, রিপাবলিকান পার্টির অভিজাতদেরও চরমভাবে হতাশ করেন। কোনো কোনো অভিজাত রিপাবলিকান নেতা শুধু হতাশই হননি, তারা বিশ্বাসও করতে পারেননি যে, এরকম স্থূল, অশ্লীল ও বেয়াকুব মানুষ কী করে হিলারির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। আসলেই ট্রাম্প জনমনে নানারকম ভীতি সৃষ্টি করেছিলেন।

কখনও বলেছিলেন, হিলারিকে জেলে ঢোকানো হবে; আবার বলেছেন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি করা হবে বাতিল। এরপরও তিনি থেমে থাকেননি, বাক্যবাণে ঝড় তোলার চেষ্টা করেছেন বারবার- বলেছেন ২০ লাখের ওপর অবৈধ অভিবাসীর স্থান নেই যুক্তরাষ্ট্রে।

আর অন্য এক জনসভায় বলেছেন, বোমা মেরে আইএসকে হটাবেন, মেক্সিকো সীমানা বরাবর দেয়াল তুলবেন এবং সুপ্রিমকোর্টে ডানপন্থী বিচারক নিয়োগ দেবেন। এর বাইরে তিনি মুসলমান ও হিস্পানিকসহ সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করেন। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, বহির্বিশ্বেও গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই সেসময়ে উদার গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সমাজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

যেখানে বর্ণবিভাজনের পর্ব পার হয়ে একটা স্বচ্ছ-সুন্দর পরিবেশ তৈরির প্রশংসিত উদাহরণ তৈরি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে ছড়িয়ে দেয়া হয় জাতিগত বিভেদের দাহ এবং তা ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে চারদিক। শুধু কি তাই, ট্রাম্পের বর্ণবাদী, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক এবং আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক কথাগুলো বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর হানে মারাত্মক আঘাত। ট্রাম্পের পক্ষের লোকজন এতটাই সহিংস হয়ে ওঠে যে, তারা মিসিসিপি রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকার একটি গির্জা ও বাড়িঘরে আগুন পর্যন্ত ধরিয়ে দেয়।

ট্রাম্পের এসব কথাবার্তা আর কাজ আপাতদৃষ্টিতে এক বেয়াকুবের অসংলগ্ন আচরণ বলে মনে হতে পারে এবং এ নিয়ে অস্থিরতা-উত্তেজনাও সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এভাবে সরলীকরণের অর্থ হল ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এসব প্রশ্ন তারাই বেশি তুলেছেন যারা ডেমোক্র্যাট, সমাজতন্ত্র ও উদারনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সমর্থক। হ্যাঁ, ট্রাম্পের কথাবার্তায় রিপাবলিকান পার্টির অভিজাতরাও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন সত্য।

তবু মানতেই হবে, তিনি কথাগুলো বলেছেন ইচ্ছা করে এবং বিশেষ একটি পরিকল্পনা সামনে নিয়ে। সেটি হল তিনি সচেতনভাবেই মার্কিনিদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ বিভেদরেখা, বর্ণবিভাজনের গণ্ডি পরিষ্কার জাগিয়ে তুলতে সফল হয়েছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ সাদা মানুষ ছিল তার সম্বল। তিনি তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, এটি হল তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই। এ লড়াইয়ে থেমে গেলে চলবে না।

বৃহত্তর এ শ্রেণির মধ্যে ট্রাম্প রীতিমতো নোংরা জাত্যাভিমান উসকে দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে কম শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটারের ক্ষোভকেও তিনি কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়েছেন। মানতেই হবে, নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ট্রাম্প ছিলেন পুরোপুরি সফল।

ট্রাম্পের ওই সাফল্যের পেছনে অবশ্য দেশের আর্থসামাজিক অবস্থারও একটা বড় ভূমিকা ছিল। সেই ১৯৮০ সালে রিগানের আমল থেকে রক্ষণশীল একটি শ্রেণি উদার গণতান্ত্রিক ভিতকে দুর্বল করার কাজে ছিল তৎপর। সেই শ্রেণি ধীরে ধীরে সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে তুলছিল। তবে অর্থনৈতিক অবস্থায় যে পরিবর্তন আসে তা ক্লিনটনের আমলে, ১৯৯২ সাল থেকে শুরু। ক্লিনটনই বিশ্বায়নের কাছে নিজেকে এমনভাবে সঁপে দেন যে, বাধ্য হয়েই শ্রমিক ও নিুআয়ের ভোটাররা হয়ে ওঠে মারাত্মক অসন্তোষ ও ক্ষিপ্ত।

এরপর আসেন জুনিয়র বুশ। তার আমলেও অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অস্থির প্রকৃতির। পূর্বসূরিদের এরকম একটা আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে ২০০৯ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বারাক ওবামা কার্যত তেমন কিছু করতে পারেননি।

যখনই তিনি ভালো কিছু করার উদ্যাগ নিতে চেয়েছেন তখনই রিপাবলিকানদের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন। তার আট বছরে ওবামা মোটেও স্বস্তিতে কাজ করতে পারেননি। পদে পদে তাকে প্রতিপক্ষের তীব্র বিরোধিতা হজম করতে হয়েছে। এর ফলে গত তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও অর্থনীতি কখনই অস্থির অবস্থার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এসবকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি মধ্যবিত্ত, নিুআয়ের সাদাদের মধ্যে আশার আলো জ্বালিয়ে ছিলেন, স্বপ্নও দেখিয়েছেন। তাই নারীবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়া সত্ত্বেও শ্বেতাঙ্গ নারীদের ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণাকালীন তিনি যে হিস্পানিকদের গালমন্দ করতে ছাড়েননি, এক হাত পর্যন্ত দেখিয়ে ছেড়েছেন, তাদেরও ২৯ শতাংশ ভোট কৌশলে নিজ পকেটে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সেই অবস্থা আর নেই। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে পরিচালিত সব জনমত জরিপেই পরিষ্কার এগিয়ে আছেন ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী জো বাইডেন। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা কম। কারণ, ১৯৩৬ সালের পর মার্কিন নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে বাইডেনের মতো করে চ্যালেঞ্জ কেউ জানাতে পারেননি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের যৌথভাবে পরিচালিত জরিপের ফলও জো বাইডেনের পক্ষে। ১১ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, অংশ নেয়া সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ৫৫ শতাংশই বাইডেনকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিপরীতে ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছেন ৪৩ শতাংশ।

গেল সপ্তাহে এ নিয়ে তিনটি উচ্চমানসম্পন্ন জরিপের ফল প্রকাশিত হয়। তাতে বাইডেন ট্রাম্প থেকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। তিনটি জরিপেই অংশগ্রহণকারীদের ৫০ শতাংশের বেশি লোক বাইডেনকে সমর্থন জানিয়েছেন। এ সম্পর্কিত অন্য দুটি জরিপের একটি সিএনএন-এসএসআরএস এবং অন্যটি ফক্স নিউজ পরিচালিত।

এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের সর্বশেষ জরিপে ১২ শতাংশ ব্যবধানে পিছিয়ে ট্রাম্প। গড়ে প্রতিটি জরিপে বাইডেনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীদের ৫২-৫৩ শতাংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে জো বাইডেন জনসমর্থনে এগিয়ে রয়েছেন ১০-১১ শতাংশ ব্যবধানে। নির্বাচনের আগে এমন চ্যালেঞ্জের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো প্রেসিডেন্টকে পড়তে হয়নি।

সিএনএন জানায়, মার্কিন নির্বাচনের আগে জাতীয় পর্যায়ে জনমত জরিপ পরিচালনার বিষয়টি মোটাদাগে শুরু হয় ১৯৩৬ সাল থেকে। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিদ্যমান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও জনমত জরিপে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র পাঁচজন। তাদের মধ্যে মাত্র একজন বিদ্যমান প্রেসিডেন্ট থেকে ৫ শতাংশ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।

১৯৯২ সালে এ চ্যালেঞ্জটি জানিয়েছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। তবে ওই চ্যালেঞ্জের কেউই ৪৮ শতাংশের বেশি জনসমর্থন নিজের দিকে টানতে পারেননি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেই নির্বাচনের একেবারে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ৫০ শতাংশের বেশি জনসমর্থন নিয়ে বিদ্যমান প্রেসিডেন্টকে চ্যালেঞ্জ জানানো একমাত্র ব্যক্তি হলেন জো বাইডেন। তিনি এবার এরই মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষের সমর্থন আদায়ের মধ্য দিয়ে নিরাপদ অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। ট্রাম্প যদি সব নিরপেক্ষ ভোটারকে নিজ দলে টানেনও তবু তার পক্ষে জাতীয় পর্যায়ে জয়ী হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

চার বছর আগের প্রেক্ষাপট এখন আর নেই। ট্রাম্পের সেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ও উগ্র-শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী বিদ্বেষ ছড়ানোর অস্ত্র বোধহয় আর কোনো কাজে আসবে না। ৩ নভেম্বরই অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। এরই মধ্যে ডাকযোগে আগাম ভোট শুরু হয়ে গেছে। সব জনমত জরিপেই পিছিয়ে থেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে ব্যস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি নিজেকে করোনামুক্ত বলে দাবি করা সত্ত্বেও করোনা নিয়ে তার বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য মার্কিনিরা পছন্দ করেনি। তার ওপর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ণবাদ, গর্ভপাত, আয়কর ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে তার বিরুদ্ধে ধূমায়িত অসন্তোষ।

এ রূঢ় বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প কি পারবেন দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে? নাকি ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জো বাইডেনের হাতে ঘটবে ক্ষমতার পালাবদল? ফলাফল নিয়ে হয়তো চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি। এজন্য বিশ্ববাসীকে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন; অন্তত নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

আতাহার খান : কার্যনির্বাহী সম্পাদক, দেশ; মুক্তিযোদ্ধা ও কবি

দেশসংবাদ/জেআর/এফএইচ/mmh


আরও সংবাদ   বিষয়:  যুক্তরাষ্ট্র   ডোনাল্ড ট্রাম্প  




আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা
২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ১১৭০০, আক্রান্তে ৫ লাখ
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এফ. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এম. এ হান্নান
যুগ্ম-সম্পাদক : মোহাম্মদ রুবাইয়াত আনোয়ার
যোগাযোগ
টেলিফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
সেলফোন : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft
logo
up