বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২১ || ১৪ মাঘ ১৪২৭
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ চট্টগ্রামের মেয়র হলেন রেজাউল করিম চৌধুরী ■ চট্টগ্রাম সিটিতে কাউন্সিলর হলেন যারা ■ প্রথম দিন করোনার টিকা নিলেন যারা ■ ৪০তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ (তালিকা) ■ এবার ভারতের সংসদ ভবনে অভিযানের ঘোষণা ■ প্রথম করোনা টিকা নিলেন নার্স রুনু ■ দেশে করোনার টিকাদান কার্যক্রম শুরু ■ বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে উঠলো রিয়াদ ■ অধিকাংশ কেন্দ্রেই নেই বিএনপি’র এজেন্ট ■ চট্টগ্রামে সংঘর্ষ-গোলাগুলি, যুবক নিহত ■ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শোডাউন ■ চট্টগ্রামে দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত ২১
সাংবিধানিক শক্তির কাছে হেরে গেলেন ট্রাম্প
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 11 January, 2021 at 1:08 PM, Update: 11.01.2021 2:19:58 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প

আমেরিকায় যে কাণ্ডটা ঘটে গেল তা যদি বাংলাদেশে ঘটত তাহলে কেমন হতো? ১৯৯১ সালে এবং ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে হেরেছে। তখন যদি শেখ হাসিনা বলতেন, না আমরা হারিনি, আবার ২০০১ সালে বলতেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, এর ফল মানি না- তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াত!

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তো ট্রাম্পের মতো কোনো নির্বাচনেই হার হয়েছে স্বীকার করেন না। তিনিও যদি ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফল না মানতেন, কী দাঁড়াত? মনে হয় গৃহযুদ্ধের মতো একটা ভয়ানক কিছু ঘটতে পারত! না, দুই নেত্রীই এমন কিছু করেননি।

দুনেত্রীই নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে যাই বলুন, ১৯৯৬ সালে বিএনপি যতই গোলমাল করুক, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের রায় মেনে নিয়েছে। শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে কখনো দ্বিধা দেখাননি।

আমেরিকা বাংলাদেশ নয়। সে গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা। অন্য দেশকে গণতন্ত্র সম্পর্কে উপদেশ দেয়। সেই দেশে গত বুধবার (৬ জানুয়ারি) যা ঘটে গেল, তা সারা বিশ্বের মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন শুধু পপুলার ভোটে জেতেননি, ইলেকটোরাল কলেজের ভোটেও জিতেছেন।

ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বীর এই জয় মানবেন না। এই নির্বাচনের ফল বাতিল করার জন্য তিনি সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত মামলা করেছেন। সেই রায়ও মানেননি। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদকের মন্তব্য, তিনি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ঘরে বসে দুটি প্ল্যান করেছিলেন।

একটি ক্যাপিটল হিলে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দলের যুক্ত অধিবেশনে হামলা চালিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি এবং সেই অরাজকতা দমনের নামে সেনাবাহিনী তলব। অন্যদিকে ইরানে আকস্মিক বোমা হামলা চালিয়ে আমেরিকাকে আরেকটি নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে তার ক্ষমতা হস্তান্তর বন্ধ রাখা।

লক্ষণীয় বিষয়, আমেরিকার ইতিহাসে যা কখনো ঘটেনি, তা ঘটিয়েছেন ট্রাম্প। তার অর্থবল ও জনবল দুই-ই আছে। আমেরিকা ফার্স্ট নামে হোয়াইট সুপ্রিমেসির যে মূলো তিনি আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীদের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন, তা নামান্তরে বর্ণবাদ-ফ্যাসিবাদ। কিন্তু ফ্যাসিবাদ একটা নেশার মতো।

সহজেই কোনো দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে প্রভাবিত করে। আমেরিকাতেও শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীদের-বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে তা প্রভাবিত করেছে।

জার্মানিতে গত শতকে হিটলারের নাজিজম যেমন তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করেছিল, তেমনি এই শতকের আমেরিকায় নয়া ফ্যাসিবাদ সাদা তরুণ ও প্রবীণ প্রজন্মের এক বিরাট অংশকে অন্ধভাবে আকর্ষণ করেছে। নির্বাচনে পরাজিত হলেও ট্রাম্প এখনো শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যে বিশ্বাসী বিরাটসংখ্যক শ্বেতাঙ্গদের আনুগত্য ভোগ করেন।

গত বুধবার তিনি এক উসকানিমূলক বক্তৃতা দিয়ে কংগ্রেস ভবনে হামলা চালাতে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদক এবং আরও অনেক মিডিয়া প্রতিনিধির মতে এটা ছিল Attempted coup বা একটি ক্যু ঘটানোর চেষ্টা। বুধবারে ট্রাম্প সমর্থকরা যখন সংসদ ভবনে হামলা চালায়, তখন ওয়াশিংটন পুলিশের একটা অংশকে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায়। যে কারণে দাঙ্গাকারীরা সংসদ ভবনের নিরাপত্তা প্রাচীর ও ব্যবস্থা ভেঙে সংসদ ভবনে ভাঙচুর চালাতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীকে ট্রাম্প তার ইচ্ছাপূরণে ব্যবহার করতে পারেননি।

তিনি প্রেসিডেন্টের পদাধিকার বলে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ। ইচ্ছা করলে তিনি সেনাবাহিনীকে যে কোনো ব্যাপারে অর্ডার দিতে পারেন, কিন্তু সেনাবাহিনী হয়তো বুঝে নিয়েছিল, প্রেসিডেন্টের অন্যায় নির্দেশ মানার চেয়ে সংবিধানের প্রতি আনুগত্যই বড় কথা।

ফলে ট্রাম্প যখন ইরানে হামলা চালানোর অভিপ্রায় নিয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন, সেনাপ্রধানেরা সবাই ইরানে হামলা চালানো ঠিক হবে না বলে প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে দেন। বুধবারের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় তিনি যে সেনাবাহিনী তলবের সাহস করেননি, তার কারণ হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সেনাবাহিনী তার কোনো অন্যায় নির্দেশ মানবে না, অন্যদিকে সিনেট এবং কংগ্রেসের সদস্যরাও সেনাবাহিনীকে কোনো কারণেই রাজনীতিতে জড়াতে চান না।

বুধবার ওয়াশিংটনে দাঙ্গা দমন করতে গিয়ে পুলিশ ৫ জন দাঙ্গাকারীকে হত্যা করেছে, বহু লোক আহত হয়েছে। বহু লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ট্রাম্প এই দাঙ্গা ও দাঙ্গাকারীদের নিন্দা করার বদলে তাদের প্রশংসা করে বলেছেন, এরা দেশপ্রেমিক। এই দাঙ্গাকে বলেছেন, তার আমেরিকা ফার্স্ট আন্দোলনের সূচনা। কিন্তু আমেরিকার অনেক মিডিয়া বলছে, এটা ট্রাম্পের ক্যু ঘটানোর চেষ্টা।

তবে এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ক্যু ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প এখন বলছেন, তিনি আগামী ২০ জানুয়ারি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। তার এই প্রতিশ্রুতিতে কারও বিশ্বাস নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের জামার আস্তিনের নিচে থাকে নিউক্লিয়ার ওয়ারের চাবি। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত এই চাবি থাকবে ট্রাম্পের কাছে। তিনি হঠকারিতার বলে এই চাবির অপব্যবহার দ্বারা কোনো অঘটন ঘটান কিনা সেই আশঙ্কা নিয়ে সেনাপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন সিনেট-স্পিকার।

ট্রাম্পকে চাপ দেওয়া হচ্ছে হয় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ, নয় ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হওয়া। ট্রাম্পের পদত্যাগের কোনো ইচ্ছা নেই এবং তিনি ইমপিচমেন্টকে থোড়াই পরোয়া করেন। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত আমেরিকার জনগণকে হয়তো গভীর উদ্বেগের মধ্যে বাস করতে হবে। ট্রাম্প কখন কী করেন তার ঠিক নেই।

সারা বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রনায়কের দ্বারা নিন্দিত হওয়ার পরও ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট পদে বসার অভিষেক অনুষ্ঠানে যাবেন না।

আমেরিকায় ট্রাম্পের পরিকল্পিত ক্যু যে ব্যর্থ হয়ে গেল, (যদি এটা ক্যু-প্রচেষ্টা হয়ে থাকে) তার একটি কারণ, শক্ত সংবিধান এবং তার প্রতি বড় দুটি রাজনৈতিক দল এবং সেনাবাহিনীর আনুগত্য। বাংলাদেশে প্রথম যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে মিলিটারি ক্যু হয়, তখন দেশের একটি খুবই ভালো সংবিধান ছিল।

এই সংবিধানের প্রতি আনুগত্য দেখায়নি চক্রান্তকারীরা এবং ক্ষমতালোভী জেনারেলরা। জেনারেল জিয়া শুধু জাতির পিতার হত্যার চক্রান্তে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ নয়, সংবিধানের চরিত্র নষ্ট করে তাকে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান থেকে ধর্মভিত্তিক সংবিধানে রূপ দেন। একই কাজ করেন তার পরবর্তী সামরিক শাসক। সামরিক শাসন উচ্ছেদের পর বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। কিন্তু ’৭২-এর মৌলিক সংবিধানে ফিরে যায়নি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। কিন্তু জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের ছিল না। ২০০৮ সালে যখন তারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে, আশা করা গিয়েছিল, যে ধর্মভিত্তিক সংবিধান দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্যকে নস্যাৎ করা হয়েছে, তাকে পরিবর্তন করে জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত বা বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাবে। আওয়ামী লীগ তা যায়নি। তারা ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি কাজগুলো সাহসের সঙ্গে করেছে।

কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানে সম্পূর্ণ ফিরে যায়নি। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ফিরিয়ে আনেনি। তারা দোহাই দিয়েছেন, জনগণ ’৭২-এর সংবিধানে এখনই ফিরে যাওয়াটা পছন্দ করত না। এই অজুহাত সমর্থনযোগ্য নয়। জাতির পিতার এই মৌলিক আদর্শ আওয়ামী লীগ আবার গ্রহণ না করার কারণ ধর্ম সম্পর্কে দলটির নেতাদের নিজেদের মনের ভয় ও দুর্বলতা।

আমেরিকায় উত্তর ও দক্ষিণের গৃহযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন সংবিধান পরিবর্তন করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আপসে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, সংবিধান হচ্ছে রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই ভিত্তিকে ক্ষমতার স্বার্থে পরিবর্তনের অধিকার আমার নেই। যদি তা করতে যাই, তাহলে সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গ করে বারবারই বিদ্রোহ হবে।

আজ ক্ষমতায় থাকার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্যু ঘটানোর চেষ্টা যে ব্যর্থ হলো, তার অনেক কারণের মধ্যে একটা কারণ হলো সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষায় দুটি বড় রাজনৈতিক দল এবং সেনাবাহিনীর অটল থাকা। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়, কিন্তু তার সংবিধান ধর্মভিত্তিক। এ কারণেও বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ঘটেছে।

এক হেফাজতি নেতা বলেছেন, ‘আমাদের সংবিধানেই আছে রাষ্ট্রধর্মের বিধান। এই বিধান ভেঙে সরকার কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে পারে না।’

আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন কীর্তি হচ্ছে, তাইওয়ানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এটা চীনের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে বিরোধ বাধিয়ে রেখে যাওয়ার অপচেষ্টা। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে তিনি আমেরিকায় গণতন্ত্রে আরও লাথি মারার চেষ্টা করবেন। এতে সফল হবেন না। তার সব চক্রান্ত ব্যর্থ করার জন্য দৃঢ় প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আমেরিকার সংবিধান।

লন্ডন, ১০ জানুয়ারি, রোববার, ২০২১

দেশসংবাদ/জেআর/এফএইচ/mmh


আরও সংবাদ   বিষয়:  আমেরিকা  




আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা
প্রথম দিন করোনার টিকা নিলেন যারা
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এম. এ হান্নান
যুগ্ম-সম্পাদক
মোহাম্মদ রুবাইয়াত আনোয়ার
মেবিন হাসান
যোগাযোগ
টেলিফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
সেলফোন : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft
logo
up