বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১ || ১২ শ্রাবণ ১৪২৮
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ আ.লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা ■ সাগরে ৭ ট্রলার ডুবি, নিখোঁজ ২০ ■ শহরে মডার্না গ্রামে সিনোফার্ম ■ ইভ্যালিতে যমুনা গ্রুপের ১০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ ■ দেশে একদিনে সর্বোচ্চ ২৫৮ জনের মৃত্যু ■ পাঁচ অতিরিক্ত সচিবকে বদলি ■ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধস, নিহত ৬ ■ শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রীদের ঢল ■ খুলনা বিভাগে আরও ৪৬ জনের মৃত্যু ■ ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা ■ আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্নীতিতে দুদকের অনুসন্ধান ■ ঋণের কিস্তি ১৮ মাস স্থগিত
ভাগিনার খোলা চিঠি-০৫
এ বি সিদ্দিক
Published : Friday, 12 March, 2021 at 1:14 AM
Zoom In Zoom Out Original Text

এ বি সিদ্দিক

এ বি সিদ্দিক

মামা,

দেশ ও জাতির নানা বিষয়ে আপনাকে জানিয়ে সময় অসময়ে বিরক্ত করছি। এর ফলাফলে আমি নিরাশ বা হতাশ নই। তবে সচেতন পাঠকের বেশ সাড়া পাচ্ছি। আমার চিঠি ছেলের হাতের মোয়া না ভেবে ছোটবেলার গল্প শোনার মত আগ্রহ নিয়ে ধৈর্যের সাথে মনোযোগ দিয়ে পড়বেন। কারণ “যেখানে যাহা পাইবে, কুড়াইয়া লইবে তাই। পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন”। চিঠিরও কিন্তু ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। ডাক হরকরা থেকে মায়ের চিঠি পাওয়ার পরপরই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঝড়, বৃষ্টি, তুফান উপেক্ষা করে, সাঁতরিয়ে নদী পার হয়ে অসুস্থ মায়ের পাশে দাঁড়ালো। মা ছেলেকে দেখার পরে মানষিকভাবে সুস্থ বোধ করলেন। কেঁচোর রসে লেখা চিঠি বাংলা গদ্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। ১৬ শতকের মাঝামাঝি (১৫৫৫-৫৬) সময়ে কোচবিহারের কোচ রাজা নরনারায়ণ যার প্রকৃত নাম মল্লদেব, অহোমকরাজ স্বর্গনারায়ণ কিংবা সুখাম্পা কে সেই চিঠি লিখেছিলেন। লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথ, কাঙাল হরিনাথ, মীর মশাররফ হোসেন, পেরীসুন্দরির স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়া। এ অঞ্চলের শাওন আকন্দ তার অশ্রু আর্কাইভ (গবেষণা ও সংগ্রহশালা) এর মাধ্যমে অভিনব ও ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাস চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে সংগ্রহ করছে ব্যক্তিগত, প্রেমের চিঠি, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডের চিঠি, গোপন কিংবা প্রকাশ্য রাজনৈতিক চিঠিসহ যে কোন ধরনের চিঠি। এসব চিঠি ইতিহাস চর্চায় অনেক নতুন তথ্য যোগ করতে পারবে বলে আর্কাইভের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দ জানায়।

জেলখানায় থাকা অবস্থায় বিদিশার কাছে এরশাদের প্রেমের চিঠি ও চিরকুট চালাচালির কারণে কারারক্ষী বাদশা মিয়ার চাকরিচ্যুত হয়েও পরবর্তীতে এরশাদের দেহরক্ষী হিসেবে আমৃত্যু বহাল তবিয়তে ছিলেন। তার সহযোগিতায় বাদশা মিয়া ঢাকা শহরে স্থাবর অস্থাবর অনেক সম্পদের মালিক। ঐদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ টাকায় কেনা কোরবানীর গরু নয়নসুখ করার জন্য আমার কাছে পাঠায়। তার যাপিত জীবনের আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর উত্থানের কারণেই চিঠি। ছোটবেলায় দেখেছি, পাড়ার বৌ-ঝি রা চাচাতো বোন ফিরোজা বুবুর কাছে রেশনের দোকানের মত লাইন ধরে বসে থাকত আত্মীয় স্বজনের কাছে চিঠি লেখানোর জন্য। স্বামী যাতে দুই একদিনের মধ্যে বাড়িতে আসে এভাবে চিঠি লেখার জন্য বুবুকে অনুরোধ করতেন। মায়ের অসুস্থতার এমনভাবে বর্ণনা দিতে হবে যাতে অফিস থেকে ছুটি মঞ্জুর হয় তাড়াতাড়ি। চিঠি হল পরস্পরের কাছে ভাব আদান-প্রদানের বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য সৃষ্টি এবং নান্দনিক কলাকৌশল। তারই প্রমাণ
“যখন তোমায় মনে পড়ে
চিঠিটা বুকে জড়িয়ে একা একা
কাঁদি।
মনে হয় যেন তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি।
এতটুকু সুখ কেড়ে নিও না,
চিঠি লিখ আমায়”
কবি মহাদেব সাহার ভাষায়,
“এইটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড় বোনা একখানি চিঠি।
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলেও
বলো ভালোবাসি”।

এই সময়ে অবলা নারীর অভিব্যাক্তি প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। আমার এই চিঠিকে উড়ো চিঠি না ভেবে একটু করে হলেও পড়িও।

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দীন মামা করোনা আক্রান্ত হয়ে পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সেবার বিড়ম্বনার কথা জানিয়ে আমার সাহায্য কামনা করেন। আফসোস! জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা লাইনে দাঁড়িয়েও করোনা টেস্ট করাতে পারছে না। এবং হাসপাতালে সিট পাচ্ছে না। স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরও এই সূর্যসন্তানেরা হাসপাতাল, ট্রেন, বাস, লঞ্চ স্টীমারে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নিতে হয়। আসলে দেশের প্রয়োজনীয় সকল সেবায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত ব্যবস্থা থাকা উচিত। অবশ্য এই ব্যাপারে নানা সমালোচনা রয়েছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভীড়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা নাস্তানাবুদ এবং বিব্রত। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা, উদাসীনতাই এর অন্যতম কারণ। প্রেসক্লাবের সাথে দক্ষিু দিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওইখানে তদবিরবাজদের ভিড়ে যেন এক মাছের বাজার। লোকের ভিড়ে এই রাস্তায় যান চলাচলের অসুবিধা হয়। কাজ নয়, কাজ শুধু আদানপ্রদানের। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধারা যে সাহায্য সহানুভূতি পাচ্ছে তাতে তাঁরা খুশি, তবে তাঁদের ত্যাগের তুলনায় তা অপ্রতুল। মুক্তিযোদ্ধাদের বেশি প্রয়োজন তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের সনদ বাতিল। এতে প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে ইতিহাস হয়ে থাকবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য সাত নম্বর সেক্টরের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক (৮৩) দীর্ঘ ৪৭ বছর অপেক্ষা করার পর “বীরবিক্রম” খেতাবের স্বীকৃতি হাতে পেল। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি উপজেলার চাপাল গ্রামে তার বাড়ি। যুদ্ধে বুকের ভেতর দিয়ে গুলি বের হয়ে যায়। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে খালেক তার দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলার জন্য বলে। কারণ তার পরিচিত মুখ রাজাকাররা দেখতে পেলে গ্রামের নিরীহ মানুষদের হত্যা করবে। এলএমজি সরিয়ে এবং বুকে আরেকটি গুলি ছুড়ে যন্ত্রণা লাঘব করতে সহকর্মী জয়নালকে অনুরোধ করে। আল্লাহর রহমতে খালেক অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ১৯৭৩ সাল থেকে খালেক খেতাবের অপেক্ষায়। ২০১১ সালে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঠিকানাবিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা প্রকাশের পর খালেক আবার আবেদন করে। কিন্তু সে আবেদনটিও ফাইল থেকে গায়েব হয়ে যায়। অনেক ধর্না দেওয়ার পর জুন মাসে বীরবিক্রম খেতাবটি লাভ করে।

বীরপ্রতীক তারামন বিবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে খেতাব তুলে দিতে ২২ বছর সময় লেগে যায় (১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর)। আগ্রার তাজমহল নির্মাণে ২০ হাজার লোক ২২ বছর কাজ করেছে। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি দে তারামন বিবির সন্ধান পান। তারামন বিবি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্নার কাজ ছাড়াও পুরুষদের সাথে অস্ত্র নিয়ে শত্রু র উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এই দুর্র্ধর্ষ কিশোরীর রণকৌশল ছিল প্রশংসনীয়। অবশেষে নিজ বাড়িতে তারামন বিবি পরলোকে পাড়ি জমান (২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর)।

এই প্রসঙ্গে স্মৃতিপটে ভেসে উঠে ছোটকালে নিজ চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, পাকসেনাদের নিষ্ঠুরতা, রাজাকারদের অত্যাচার। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। ঢাকা তখন পাকসেনাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদসহ হাজার হাজার পাকসেনাদের চট্টগ্রামমুখী রওনা। ফেনী সদরে পৌঁছার আগে মোহাম্মদ আলী বাজারে (দুলামিয়া রাস্তা) আসার সাথে সাথে আনুমানিক সময় ১০টায় অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক জলিলের এলএমজি থেকে ফায়ার। এলাকার সদ্য ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল থেকেও গুলি ছোড়া হয়। এতে পাকসেনারা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে এবং গাড়ি থেকে নেমে ফায়ার করতে করতে গ্রামে ঢুকে পড়ল। গ্রামের আমতলী বাজারসহ এলাকার অনেক বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিল। পাকসেনারা ওইদিন মহিলা-পুরুষ মিলিয়ে ১৭ জনকে হত্যা করল। সদ্য গ্রাজুয়েট হাদী ও তার নববধূকে একই কেল্লায় ব্রাশফায়ার। এলাকাবাসী জীবন বাঁচাতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একিনপুর ও ছোত্তাখোলায় আশ্রয় নিল। দাউ দাউ করে বাড়িঘর জ্বলছে। মানুষের চিৎকার। আমিও বুবুর জমানো সিকি আধুলির বাঁশের খুটিটি কাঁধে নিয়ে সোজা বর্ডার পার। বর্ডারের সাথেই আমাদের গ্রাম।

যুদ্ধের নয়টি মাস ফেনীর উত্তরাঞ্চল অর্থাৎ বর্ডার সংলগ্ন ধর্মপুর ইউনিয়ন রণক্ষেত্রে পরিণত ছিল। তিনজন ইপিআর (বিজিবি) সদস্যকে অসহযোগ আন্দোলনের সময় (বিহারী-বাঙ্গালী বিরোধের কারণে) মেরে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। এই কারণে রাজাকারদের ইশারায় পাকসেনারা বারবার এলাকায় এসে যুবকদের মুক্তিযোদ্ধা মনে করে ধরে নিয়ে মেরে ফেলত। রাতে চলত গোলাগুলি, দিনে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ বিচরণ। এলাকাবাসী প্রতিদিন ছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মা বোনদের ওপর অত্যাচার তো ছিলই। জীবন বাজি রেখে এলাকাবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করত। এখনো গবেষণা করলে এলাকায় পাকসেনাদের হাতে নিহতদের বড় একটি তালিকা বেরিয়ে আসবে এবং ১৭ এপ্রিলে নিহত ১৭ জনের পরিবার সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে।

মামা, ওইদিন ফেরিওয়ালা “কষ্ট নেবে? কষ্ট?” বলে ডাক দিল। এক অভিনব নিবেদন। বাসাটি আমার মেইন রোডের ওপর। ফেরিওয়ালাদের নানান সুরে হরেক রকম আওয়াজ পাওয়া যায়। নতুন আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ফেরীওয়ালাকে ডাকলাম। “ভাই, কষ্টের কোন দরকার নেই, দরকার আমাদের লজ্জার”। লজ্জা আছে কিনা জিজ্ঞাসা করতেই ফেরিওয়ালা চোখের আড়াল হয়ে গেল। আসলে আমাদের কষ্টের স্টক লট হয়ে আছে। কষ্টের সীমা পরিসীমা নেই। অর্থকষ্ট, পাওয়া না পাওয়ার কষ্ট, ভেজাল আর নকলের কষ্ট, ধর্ষিতার কষ্ট, শোষিতের কষ্ট, বৃদ্ধাশ্রমে থাকার কষ্ট, প্রতারকের কষ্ট, ভুল চিকিৎসার কষ্ট, নষ্ট হওয়ার কষ্ট, আলোর মাঝে কালোর কষ্ট, অন্ধ আর অন্ধকারের কষ্ট, ডুবন্ত লঞ্চে মায়ের কোলে শিশুর মৃত্যুর কষ্ট, জীবনের কষ্ট, জীবিকার কষ্ট, বেকারত্বের কষ্ট, ক্ষমতা পাওয়ার কষ্ট, ক্ষমতা হারানোর কষ্ট, গুম আর খুনের কষ্ট, ভ্যাট অফিসের কষ্ট, ট্যাক্স অফিসের কষ্ট, ত্রাণের কষ্ট, বানের কষ্ট, বাঁধভাঙ্গা জোয়ারে বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ার কষ্ট, খোলা আকাশের নিচে বসবাসের কষ্ট, অর্ধাহার-অনাহারের কষ্ট, কষ্টে কষ্টে জীবন নষ্ট। তাইতো গোলাপী এখন ট্রেনে বাংলা ছায়াছবির গানটি মনে পড়ে, “হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ। এই জীবন জ্বইলা পুইড়া শেষ তো হইল না”।

আমাদের এখন লজ্জার দরকার। শৈশবকালে দেখেছি সন্তান জন্মের পর বালিশের পাশে দোয়াত কলম রাখা হত। যাতে করে ছেলে বড় হয়ে লেখাপড়া করে। এখন মনে হচ্ছে একইসাথে লজ্জাবতী গাছও রাখা উচিত। শুধু শিক্ষিত হলে হবেনা, লজ্জা শরমও দরকার আছে। মানুষ এখন চশমখোর, লজ্জা শরমের বালাই নেই। শতভাগ রপ্তানীমুখী মুন্নু গ্রুপ অব কোম্পানীতে কিছুদিন চাকরি করেছি। বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের সার্কুলার (২৫ নং) অনুযায়ী রপ্তানীমুখী শিল্পের ২৫% ক্যাশ ইন্সেন্টিভ এর টাকার জন্য সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিসে এক্সপোর্ট শাখায় আমার আসা যাওয়া ছিল। এক্সপোর্ট ডকুমেন্টস জমা দিয়ে প্রনোদনার টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে কিনা তা তদারকি করার দায়িত্ব ছিল আমার। অফিসার গোলাম মোস্তফার টেবিল হতে শুরু করে এসপিও (সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার) পর্যন্ত শুধু দক্ষিণার বাতাস। প্রতিদিন অথবা মাসিক, টেবিলে টেবিলে টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না। নাসের গার্মেন্টসের কমার্শিয়াল এমদাদ অথবা বেক্সিমকোর কমার্শিয়াল শান্তনুর চোখে মুখে ছিল হতাশার ছাপ। কারণ টাকা না দিলে অফিসার টেবিলে থাকে না। অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলে বলতো, “দক্ষিনার বদৌলতেই এই টেবিলে পোস্টিং”।

চক্ষুলজ্জা ত্যাগ করে ঘুষের টাকা যেভাবে পকেটভর্তি করত, তা আজো চোখের সামনে ভেসে উঠে। এই টাকা নিয়ে মার্কেটে বড় মাপের খদ্দর অথচ ছেলেমেয়ে অথবা স্ত্রীর মনে একবার ও প্রশ্ন উদয় হয়নি যে বাবা বা আমার স্বামী ব্যবসায়ী না, বেতনভূক কর্মচারী। এত টাকা কোত্থেকে আসল। আত্মসম্মান, লাজলজ্জা সমাজ থেকে বিতাড়িত। সরকার বেতন বাড়ায়, সমতালে ঘুষের পরিমাণও বাড়ে। শিল্পী কামরুল হাসান বেঁচে থাকলে হয়ত কাঁর্টুন এঁকে লিখে দিতেন,! দেশ আজ নির্লজ্জ বেহায়াদের খপ্পরে”। সরকারী অফিস আদালতে এদের দৌরাত্ম্য ও প্রাধান্য বেশি। ঘৃণার বদলে সমাজ এদের পুরস্কৃত করছে। মেয়ের বাবার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের চেয়ে পুলিশের একজন এসআই এর প্রাধান্য বেশি। হায়রে চাকচিক্যের সমাজ!

মামা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের ৪৬১ জন প্রতিবন্ধীকে মানবিক সাহায্য হিসেবে অর্থ ও পোশাক দিয়েছেন। প্রতিবন্ধীদের চাহিদা মোতাবেক বহুমাত্রিক শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রতিবন্ধী স্কুল স্থাপন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ এবং চাহিদামাফিক প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ যেমন হুইলচেয়ার, ট্রাইসাইকেল, হিয়ারিং ডিভাইস ও দৃষ্টিসহায়ক উপকরণ সরবরাহের নির্দেশনা প্রদান করেন। প্রতিবন্ধীদের হতাশার মাঝে হঠাৎ আশার আলো জ্বালিয়ে দিলেন। বেঁচে থাকার সাহস যোগালেন। এটা একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেপাড়ায়, পাহাড়ি ও সমতল ভূমির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অথবা দেশের অনগ্রসর এলাকা ও এলাকার লোকজনের উপর বিশেষ নজর দিলে ভাগ্য বিড়ম্বিত অসহায় লোকদের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটবে। তাদের মনে উচ্ছ্বাস ও আনন্দ আসবে। আজীবন প্রধানমন্ত্রীকে শান্তির দূত হিসেবে স্মরণ করবে। জাতির পিতার আত্মা শান্তি পাবে। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নটি পূরণ হবে। বর্তমান আইজি সাহেব জাতীয় প্রেসক্লাবের কর্মচারীদের মাঝে ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষ্যে বিভিন্ন ঈদ সামগ্রী বিতরণ করেছেন। কর্মচারীরা এতে খুশি হয়েছে। বাতির নিচেই থাকে অন্ধকার। অনেকে বুঝতে চায় না। আইজি সাহেব সারা বাংলাদেশে মিরপুরে পুলিশ স্মৃতি কলেজের মত এরকম আরো ১০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে একজন কলেজ শিক্ষক আমাকে জানান। সামাজিক দায়িত্বের প্রতিও আইজি সাহেবের নজর রয়েছে। আইজি সাহেবকে ধন্যবাদ।

মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফরাসী পরিব্রাজক ফ্রাসোয়া বার্নিয়ে। তার লেখা ‘বার্নিয়েরস ট্রাভেলস ইন দ্যা মুগল এম্পায়ার বইতে’ মগ দস্যুদের কালো সন্ত্রাসের কাহিনী তুলে ধরেছেন। আরাকান অথবা আজকের মায়ানমার থেকে আসা মগ দস্যুদের অত্যাচারে গ্রামের পর গ্রাম মানুষ শূন্য হয়ে জঙ্গলে পরিণত হতো। ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয় করার পর মগদের ঝেটিয়ে বিদায় করেন। কিন্তু মগের মুল্লুক শব্দটি বাঙ্গালীদের ঘাড়ে রয়ে গেছে। রাজাকার মানে স্বাধীনতাবিরোধী পাকসেনাদের দোসর ও তাদের মদদদাতা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদের অপকর্ম মানুষ ঘৃণার চোখে দেখে।

বর্তমানে কথায় কথায় রাজাকার শব্দটি ঘৃণিত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনুরূপভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মীর জাফর আলী খান ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র করে নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করে। কিন্তু মীর জাফর আলী খান তিন মাসও সিংহাসনে টিকে থাকতে পারেনি। বরং মীর জাফর হিসেবে সর্বত্রই ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এবং কেউ কারো সাথে ষড়যন্ত্র করলেই মীরজাফর বলে চিহ্নিত করে। বাবা ছেলেকে বলছে, “তুমিও কি আমার সাথে পলিটিক্স করো?” অর্থাৎ বর্তমান রাজনীতিবিদদের তাদের ওয়াদার বরখেলাপের জন্য অথবা ছলছাতুরির জন্য মানুষ এদের বিশ্বাস করেনা। এদের উপর আস্থাহীনতা। অনেকে মনে করে পলিটিক্স মানে সাধারন জনগণের সাথে প্রতারণা (যদিও সবার বেলায় প্রযোজ্য নয়)।

বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় দুর্নীতির বিষবৃক্ষ। আসলে এই বিষবৃক্ষের দেখা মিলেছে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে। এই গাছের শাখা প্রশাখা এমনকি ফল পর্যন্ত বিষাক্ত। মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে এমনকি মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের রক্তের সাথে দুর্নীতি মিশে আছে। প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানেই এই বিষবৃক্ষের চারা রোপন করা আছে। দুর্নীতির এই বিষবৃক্ষের কারণে দেশ রসাতলে যাচ্ছে, বিদেশে দেশের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। বাংলাদেশের নামের আগে পরে দুর্নীতি শব্দটা জড়িয়ে যাচ্ছে। পাসপোর্ট দেখলেই বিদেশীরা অনুমান করে নিবে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের লোক। এরা করোনা টেস্টে দুর্নীতি ও ওষুধে ভেজাল করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অন্য দেশের লোকেরা দুর্নীতি করলেও দোষ পড়বে বাংলাদেশের মানুষের উপর। দুর্নীতি শব্দটি ‘মগের মুল্লুক’ এর মত বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ে চেপে বসার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্তঃসারশূন্য বক্তব্য না দিয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকা আমাদের উচিত। নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে না চাপিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ নিজের দায়িত্ব পালন করার উপযুক্ত সময়।

সক্রেটিস বলেছেন, Know Thyself। অর্থাৎ কি করেছি, কি বলছি আর কি করা উচিত। এই প্রশ্নগুলো সামনে রেখে অন্ধকারে ঢিল না মেরে জবাবদিহিতার মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন। তা না হলে দেশ ও জাতি পিছিয়ে পড়বে। এই বিষয়ে একটি গল্প রয়েছে। বরিশালের এক ছেলে সদরঘাটে নামলো। নেমে শুনলো পাশে দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে এবং বিজয়ীকে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। শুনে ছেলেটি খুশিমনে প্রতিযোগিতায় দাঁড়ালো। ছেলেটি খালি পায়ে অথচ অন্যান্য প্রতিযোগিরা প্রতিযোগির মতই প্রস্তুত। পিস্তলের ফাঁকা আওয়াজে ছেলেটি এত জোরে দৌড় দিল একেবারে প্রথম। তার হাত ধরে সবার সামনে এনে জিজ্ঞাসা করা হলো,“তুমি কিভাবে ফার্স্ট হয়েছো? তুমি তো আমাদের প্রতিযোগি ছিলে না”। উত্তরে ছেলেটি বলল, “প্রতিযোগিদের লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম বটে, কিন্তু গুলির আওয়াজ শুনে জান বাঁচাতে খুব জোরে দৌড় দিয়েছি। এখানে যে এত বড় প্রতিযোগিতা তা আমার মাথায় ছিল না।”

ইতি
আপনার ভাগিনা
এ বি সিদ্দিক
মিরপুর, ঢাকা


(চলবে…)

দেশসংবাদ/এবিএস/এফবি/এমএইচ


আরও সংবাদ   বিষয়:  মামা  


আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা
শহরে মডার্না গ্রামে সিনোফার্ম
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
সহযোগি সম্পাদক
এনামুল হক ভূঁইয়া
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
এম. এ হান্নান
সহকারি সম্পাদক
মোহাম্মদ রুবাইয়াত আনোয়ার
মেবিন হাসান
যোগাযোগ
টেলিফোন
০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবাইল ফোন
০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল
[email protected]
ফেসবুক
facebook.com/deshsangbad10

Developed & Maintenance by i2soft
logo
up