বুধবার, ১২ মে ২০২১ || ২৯ বৈশাখ ১৪২৮
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ কাশিমপুর কারাগারে মামুনুল হকসহ ১৪ হেফাজত নেতা ■ ইসরাইলে নজিরবিহীন রকেট হামলা (ভিডিও) ■ বাবুল আক্তারকে গ্রেফতার দেখাবে পিবিআই ■ ঢাকায় পৌঁছাল ৫ লাখ চীনা টিকা ■ খালেদা জিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন-জাপান রাষ্ট্রদূতের চিঠি ■ গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক হামলায় নিহত ৩৫ ■ ভারতে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ■ ৯ দিনে ৮ হাজার কোটি টাকা ■ শিমুলিয়া ঘাটে বাঁধভাঙা জনস্রোত ■ বায়তুল মোকাররমে ঈদের ৫ জামাত ■ সাবেক এসপি বাবুল আক্তার গ্রেফতার ■ সৌদি আরবে বৃহস্পতিবার ঈদ
বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে কৃষক, পথে বসছে পরিবার
দেশসংবাদ ডেস্ক
Published : Thursday, 8 April, 2021 at 11:24 PM, Update: 08.04.2021 11:47:54 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে কৃষক, পথে বসছে পরিবার

বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে কৃষক, পথে বসছে পরিবার

বজ্রপাতে অনেক কৃষক মারা যাচ্ছে। এতে তাদের  পরিবার পথে বসছে। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা শঙ্কর সরকার (২২)। বাবা মারা গেছেন ১৪ বছর আগে। মা রেবা রানী ও তিন বোন নিয়ে চার সদস্যের সংসার। পিতৃহীন সংসারে অনেক কষ্ট করে দুই বোনকে বিয়ে দিয়েছেন শঙ্কর। ভেবেছিলেন ছোট বোন রোম্পা রানী দাসকে পড়াশোনা শিখিয়ে ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দেবেন। কিন্তু হলো না। গত বছরের ১৮ এপ্রিল হাওরে ফসলি জমিতে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে মারা যান তিনি। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন নিঃস্ব।

শঙ্কর সরকারের দুলাভাই রাতুল দাস বলেন, আমার শ্বশুর মারা গেছেন ১৪ বছর। একমাত্র ছেলেকে দিয়ে সংসার চলছিল শাশুড়ির। কিন্তু গত বছর বজ্রপাতে মারা গেছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন নিঃস্ব।

পরিবারটি কীভাবে চলে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাই। আমার দুই ছেলে-মেয়ে রয়েছে। কষ্ট হলেও তাদের দেখাশোনা করি।

রেবা রানী দাস বলেন, আমার ছেলে থাকতে অভাব বুঝিনি। পরিবারের সব খরচ বহন করত। মারা যাওয়ার পর কিছু জমি-জমা ছিল; সেগুলো বন্ধক রেখেছি। বড় মেয়ের জামাই দেখাশোনা করে আমাদের। এখন ঘরে থাকা মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় আছি। 

রোম্পা রানী দাস শাল্লা ডিগ্রি কলেজ থেকে এবার এইসএসসি পাস করেছেন। অভাব-অনটনে সংসারে এখন তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার পথে।

রোম্পা রানী দাস বলেন, ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। সংসারের হাল ধরেছে একমাত্র ভাই। ভাই পড়াশোনা না করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। এখন সংসারই চলে না। পড়াশোনা করব কীভাবে। আর পড়াশোনা করব না।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন বছরে সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই কৃষক। কৃষিকাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে তাদের মৃত্যু হয়। সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন দিরাই উপজেলায় ১০ জন। পাশাপাশি জামালগঞ্জ উপজেলায় মারা গেছেন নয়জন, ধর্মপাশায় আটজন, দোয়ারাবাজারে ছয়জন, সদরে দুজন, তাহিরপুরে দুজন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে দুজন, ছাতকে দুজন, জগন্নাথপুরে একজন ও শাল্লায় একজন।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাঁচগুইয়া হাওরে ধানকাটার সময় বজ্রপাতে কৃষক ফরিদ মিয়ার (৩৫) মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের গাজীনগর গ্রামের আমিরুল ইসলামের ছেলে। স্ত্রী ও পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে তার। ফরিদ মিয়া মারা যাওয়ায় তার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া বড় ছেলে পাভেল এখন আর বিদ্যালয়ে যায় না। অভাবে সংসার চলছে না তাদের।

ফরিদ মিয়ার স্ত্রী রুমি বেগম বলেন, গত বছর হাওরে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে দুটি গরু ছিল। হঠাৎ বজ্রপাতে তিনি মারা যান। দুটি গরুও মরে যায়। এখন মানুষের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে সংসার চালাই। অভাবের কারণে সন্তানদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে কাজে পাঠাই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কীভাবে সংসার চলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ভাই ওমান থাকে। মাঝেমধ্যে কিছু টাকা দেয়। পাশাপাশি মানুষের কাছ থেকে কিছু সহায়তা নিই। এ দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।

রুমি বেগম বলেন, আমাদের জায়গাজমি নেই। অন্যের জমিতে একটা ঘর বানিয়ে থাকি। এখন ঘরটাও ভেঙে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই পাঁচ সন্তানকে নিয়ে খাটের তলায় আশ্রয় নিই।

গত ৬ সেপ্টেম্বর দেখার হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে একই উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের রইব্বা মিয়ার ছেলে মিঠু মিয়া (২৮) বজ্রপাতে মারা যান।

মিঠুর দুই বোন ও এক ভাই। মিঠুর মৃত্যুতে ছোট ভাই দুদু মিয়া (২২) ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করে সংসারের হাল ধরেছেন। দুই বোনের মধ্যে পারভীন বেগমের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন চন্দনা আক্তারকে নিয়ে মা সাবিয়া বেগম গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

চন্দনা আক্তার বলেন, আমার মায়ের অসুখ। টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারছি না। বড় ভাই গত বছর মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা গেছেন। এরপর থেকে আরেক ভাই ঢাকায় কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। এখন এক ভাইয়ের রোজগার দিয়েই চলছে সংসার।

জগন্নাথপুর উপজেলায় বাউধরন গ্রামের তবারক মিয়ার ছেলে শিপন মিয়া (৩৩) হাওরে গরু চরাতেন। গত বছরের ১৮ এপ্রিল হাওরে বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ের বয়স আড়াই বছর। মারা যাওয়ার তিন মাস পর আরেক ছেলের জন্ম হয়। বর্তমানে পরিবারটি আর্থিক সংকটে রয়েছে।

শিপন মিয়ার বড় ভাই ফুলসাদ মিয়া বলেন, আমাদের অভাবের সংসার। একবেলা খেলে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হয়। তাই শিপনের পরিবারকে সহায়তা করতে পারি না।

শিপন মিয়ার স্ত্রী শেফালি বেগম বলেন, ভিটায় যে ঘর ছিল তা ভেঙে গেছে। বৃষ্টি হলে দৌড়ে আরেকজনের ঘরে আশ্রয় নিই। মানুষের কাছ থেকে সহায়তা নিলে সংসার চালাই।

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, গত কয়েক বছরে হাওরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। অথচ ৫০ বছর আগে বজ্রপাতে এত মৃত্যু ছিল না।

বজ্রপাতে মারা যাওয়া ফরিদ মিয়ার ঘর
প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়নের পাশাপাশি মোবাইল টাওয়ারগুলো একটি থেকে আরেকটির সঠিক দূরত্ব না থাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় বজ্রপাতে প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ মোবাইল টাওয়ারের মাধ্যমে ভূগর্ভে চলে যায়। কিন্তু দুটি মোবাইল টাওয়ার সঠিক দূরত্বে না থাকলে বজ্রপাতের থেকে সৃষ্ট বিদ্যুৎ হাওরের খোলা জায়গায় পড়ে যায়। এতে সাধারণ কৃষক মারা যান।

সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট খলিল রহমান  বলেন, হাওরে বজ্রপাতে যারা মারা গেছেন তারা কৃষক। তাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল পরিবার। মৃত্যুর পর সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ২০ হাজার টাকা কিছুই না। তারা যেহেতু আমাদের খাদ্য জোগান দেন; তাই তাদের পরিবারকে নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য তাদের সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। বজ্রপাত রোধে সভা-সেমিনার নয়; বরং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।

সুনামগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি পঙ্কজ দে বলেন, আমাদের খাবার উৎপাদন করতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান কৃষকরা। প্রতি বছর বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। মৃত্যুর পর ২০ হাজার টাকা সহায়তা না দিয়ে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে; যাতে সারাজীবন তাদের পরিবার ভালোভাবে চলতে পারে। পরিবারগুলো যেন সংকটে না পড়ে, সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা বজ্রপাতে মারা গেছেন তাদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অনেক পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে ২০ হাজার টাকা কিছুই না। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে থাকলেও এর চেয়ে বেশি সহযোগিতার সুযোগ নেই আমাদের।

সুনামগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন, বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে যেটা দেওয়া হয়; এর বাইরে সহায়তার সুযোগ নেই। সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়মিত ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে ইউনিয়ন থেকে তাদের সরকারি সহায়তা অথবা ভিজিএফ কার্ডের ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হয়।

দেশসংবাদ/ডিপি/এসআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  বজ্রপাত   কৃষক   পরিবার  


আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা
ঢাকায় পৌঁছাল ৫ লাখ চীনা টিকা
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
সহযোগি সম্পাদক
এনামুল হক ভূঁইয়া
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
এম. এ হান্নান
সহকারি সম্পাদক
মোহাম্মদ রুবাইয়াত আনোয়ার
মেবিন হাসান
যোগাযোগ
টেলিফোন
০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবাইল ফোন
০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল
[email protected]
ফেসবুক
facebook.com/deshsangbad10

Developed & Maintenance by i2soft
logo
up