রবিবার, ২০ জুন ২০২১ || ৫ আষাঢ় ১৪২৮
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ শিগগিরই ৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ ■ প্রতি ভরিতে স্বর্ণের দাম কমল ১৫১৬ টাকা ■ রাজধানীর ফুটপাত থেকে মৃতদেহ উদ্ধার ■ সোমবার ফাইজারের টিকা প্রয়োগ শুরু ■ ৫৩ দিন পর বাসায় ফিরলেন খালেদা জিয়া ■ বগুড়ায় লকডাউন ঘোষণা ■ করোনায় আরও ৬৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৩০৫৭ ■ ইরানের প্রেসিডেন্ট হলেন ইব্রাহিম রাইসি ■ জাতিসংঘের মহাসচিব পদে ২য় মেয়াদে গুতেরেস ■ ২৪ ঘণ্টায় বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড ■ রাজধানীতে একই পরিবারের ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার ■ পাগলা মসজিদের দানবাক্সে ১২ বস্তা টাকা-স্বর্ণালঙ্কার
নিজেই রোগাক্রান্ত রংপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল
আফরোজা সরকার, রংপুর
Published : Tuesday, 8 June, 2021 at 8:29 PM
Zoom In Zoom Out Original Text

নিজেই রোগাক্রান্ত রংপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল

নিজেই রোগাক্রান্ত রংপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল

রোগীর চাপ নেই। নেই সেবা না পাওয়ার অভিযোগ। চিকিৎসক ও নার্সসহ অন্য স্টাফরা আছে, তবে সংখ্যায় জনবল কম। জুনিয়র কনসালটেন্ট পদটি তিন বছর ধরে শুন্য। পাঁচ বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে এক্স-রে মেশিন। জরাজীর্ণ ভবনে রয়েছে ফাটল আতঙ্ক।  স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। খসে পড়ছে পলেস্তারা। রোগীদের বিছানা থেকে টয়লেট, বাথরুম সবই অপরিচ্ছন্ন। এরকম নোংরা পরিবেশে কোনো রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে রংপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি।

ষাটের দশকে নির্মিত এই হাসপাতালটির নানা সমস্যায় উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরাও। আর রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা বলছেন, নিরুপায় হয়েই এখানে চিকিৎসা নিতে আসতে হয়। তা না হলে কেউই আসত না ভুতুরে এই হাসপাতালে।

সোমবার (৩১ মে) দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, সুনসান নীরবতা হাসপাতাল জুড়ে। চিকিৎসক সংকট আর দুর্বল অবকাঠামোর কারণে হাসপাতালটি যেন নিজেই রোগাক্রান্ত। হাসপাতালের নোংরা পরিবেশে যত্রতত্র পড়ে আছে রোগীদের বেডগুলো। শৌচাগারও ব্যবহারের অনুপযোগী। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। মরিচা পড়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়েছে প্রয়োজনীয় আসবাসপত্র। বাহিরে মাঠে থাকা টিউবয়েলটিও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডসহ একটি টয়লেট ও বাথরুমের সংস্কার কাজ চলছে।

এই হাসপাতালের পাশেই রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বক্ষব্যাধি ক্লিনিক। সেখানকার এক্স-রে মেশিনটি পাঁচ বছর ধরে অচল। নেই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। মাত্র একজন চিকিৎসক আর দশজন স্টাফ দিয়ে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। এছাড়াও জনবল কম থাকায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রাক থেকে দুইজন ও যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি হতে আরও দুইজন সেখানে কাজ করছেন। যেন হাসপাতালের মতোই এই  ক্লিনিকেরও বেহাল দশা।

একটি জিন এক্সপার্ট মেশিন দিয়ে রোগীদের কফ পরীক্ষা করা হয়। দুইতলা বিশিষ্ট এই ক্লিনিকে দশটি কক্ষ রয়েছে। পাঁচটি টয়লেটের তিনটিই ব্যবহার অনুপযোগী। দীর্ঘদিনের পুরাতন দরজা-জানালার অবস্থা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। ক্লিনিকের পিছনের দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। কর্তৃপক্ষ বক্ষব্যাধি ক্লিনিকটি সংস্কারের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে চিঠি দিয়ে অবগত করছেন।

জানা গেছে, বর্তমান রংপুর নগরের তাজহাটে ১৯৬৫ সালে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসার জন্য বক্ষব্যাধি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। একতলা একটি ভবনের ছয়টি কক্ষে চলছে হাসপাতালের চিকিৎসা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। এর মধ্যে একটি মহিলা ও দুটি পুরুষ ওয়ার্ড। অন্য তিনটি কক্ষে চিকৎসক, কর্মচারীদের বসার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলে। ২০ শয্যার এই হাসপাতালে চারটি মহিলা বেড ও ষোলটি পুরুষ বেডের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে সেখানে দুই চিকিৎসক ও ১০ জন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। এদের মধ্যে চিকিৎসক ছাড়াও তিনজন সিনিয়র স্টাফ নার্স, সহকারী নার্স তিনজন, ওয়ার্ডবয় দুইজন, বাবুর্চি দুইজন এবং একজন ফার্মাসিস্ট রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের ভিতরে পুরুষ ওয়ার্ডে টাইলস লাগানোসহ ছোটখাট সংস্কার কাজ করানো হচ্ছে। সেখানে খাতাকলমে ৬ জন রোগী ভর্তি থাকলেও তাদের কাউকে বেডে থাকতে দেখা যায়নি। বরং ওয়ার্ডের ভিতর থেকে বেডগুলো বাহিরে বের করে রাখা হয়েছে। দেখা মেলেনি কথা বলার মতো দায়িত্বরত চিকিৎসক বা অন্য কাউকে।

হাসপাতালের দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্স মো. শামছুল আলম দৈনিক দাবানলকে বলেন, আগের মতো এখন রোগীর চাপ নেই। এখন মাসে ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ জন পর্যন্ত রোগী ভর্তি হয়। বর্তমানে চারজন পুরুষ ও দুই নারী রোগী ভর্তি রয়েছেন। একেকজন রোগী এক থেকে তিন মাস পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা সেবা নেন। সংস্কার কাজ শুরু হওয়াতে হাসপাতালের নিকটবর্তী রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে বাসা গেছেন। তবে তারা হাসপাতাল কাছাকাছি হওয়াতে যখন ইচ্ছে আবার চলেও আসেন।

তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটির সংস্কার হয়নি। একারণে দেয়াল স্যাতস্যাতে হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে পলেস্তারাও খসে পড়ে। এক সপ্তাহ আগে পুরুষ ওয়ার্ডের মেঝেতে টাইলস বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়াও একটি টয়লেট ও বাথরুম ছাড়াও কিছু দেয়ালের পলেস্তারা সংস্কার করা হচ্ছে। কিছু কক্ষ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে থাকায় সেগুলোতে এখন তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছে।

রোগী ভর্তির ফাইল ঘেঁটে ছয়জনের নাম, পরিচয় ও ভর্তির তারিখ জানা গেছে। এদের মধ্যে কেউ জানুয়ারী মাসে, আবার কেউ ভর্তি হয়েছেন মার্চে। ছয় রোগীর চারজনই হাসপাতাল সংলগ্ন উত্তর বাবুপাড়া, তাজহাট বাবুপাড়া, মাহিগঞ্জ রাজবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। এদের মধ্যে মুঠোফোনে গোপাল মহন্ত নামে এক যক্ষা আক্রান্ত রোগীর সাথে কথা হলে তিনি দৈনিক দাবানলকে জানান, তার বাড়ি তাজহাট রাজবাড়ী এলাকাতে হওয়ায় সে হাসপাতালে থাকেন না। বেশির ভাগ সময়ে ওষুধ লাগলে হাসপাতালে যান। চিকিৎসক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা এবং হাসপাতালে থাকার মতো পরিবেশ নেই বললেই চলে। বিকেলের পর হাসপাতালে ভুতুরে পরিবেশ তৈরি হয়।

হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানীয় এক দোকানদার   না প্রকাশের শর্তে জানান, হাসপাতালটিতে আগের মতো রোগী থাকে না। চিকিৎসকেরাও নিয়মিত আসেন না। শুধু জনবল সংকটই নয়, সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকে না। রোগীদের বেশির ভাগ সময় বাহিরে গিয়ে এক্স-রেসহ অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ক্লিনিকে গিয়ে রোগীদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ নিতে চিকিৎসকের দারস্ত হয়েছেন রোগীরা। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত রোগী দেখেন একজন চিকিৎসক। রংপুর ছাড়াও মাঝে মধ্যে দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও জেলা থেকেও যক্ষার চিকিৎসা নিতে রোগীরা এই ক্লিনিকে আসেন। খুব বেশি অসুস্থ হলে ক্লিনিক থেকে ভর্তি করে রোগীদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ক্লিনিকে আসা জুথিঁ আকতার নামে এক রোগী  বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে বেশ কাশ হচ্ছে। অসুস্থতা একটু বেশি মনে হওয়ায় ডাক্তার দেখাতে এসেছি। অনেকক্ষণ ধরে সিরিয়ালে আছি। তবে একজন ডাক্তার দিয়ে এতগুলো রোগী দেখানোর কারণে সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ক্লিনিকে ডাক্তারসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়ানো জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেখানে রোগী দেখাতে ব্যস্ত থাকা চিকিৎসক আব্দুর রউফ বলেন, একজন চিকিৎসকের পক্ষে প্রতিদিন চার ঘণ্টায়৩০ থেকে ৫০ রোগী দেখা ও প্রেসক্রিপশন করা কষ্টকর ব্যাপার। ক্লিনিকে জনবল সংকট রয়েছে। এ কারণে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাথে সমন্বয় করে ক্লিনিকে রোগী দেখা হয়।

বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মেশকাতুল আবেদের চেম্বারে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশের শর্তে সেখানকার এক কর্মচারী জানান, হাসপাতালের মতো ক্লিনিকেরও অবকাঠামো খুব দুর্বল। অনেক আগে নির্মিত ভবনটির সংস্কার হয়নি। মাস তিনেক আগে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর থেকে অফিস কক্ষ রং করা হয়েছে। সংস্কার কাজের জন্য নতুন বরাদ্দ এসেছে।

ব্রাক থেকে এই ক্লিনিকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) হিসেবে দায়িত্বে থাকা গোলাম রব্বানী   জানান, জনবল সংকট থাকার কারণে তিন বছর ধরে ব্রাক থেকে সেখানে দুইজন সার্ভিস দিচ্ছেন। বক্ষব্যাধি হাসপাতাল রয়েছে। কিন্তু রোগীদের উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য উন্নত মেশিন ও ল্যাবরেটরি নেই। ক্লিনিকের ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন নষ্ট থাকার কারণে রোগীদের বাহিরে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

ক্লিনিকের অফিস সহকারী রুহুল আমিন   বলেন, ২০১৫ সাল থেকে এক্স-রে মেশিন বন্ধ রয়েছে। মেশিনটির অনেক সমস্যা ছিল। কিছুদিন আগে কিছু মেরামত কাজ করা হয়েছে। আলাদা একটি কক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমাদের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নেই। আশা করা হচ্ছে খুব শীঘ্রই এক্স-রে মেশিনটি পুরোপুরি মেরামত কাজ শেষ হলে পুণরায় চালু করা সম্ভব হবে।  

ক্লিনিক ও হাসপাতালটির সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. হিরম্ব কুমার রায়। তিনি সাংংবাদিকে বলেন, এই হাসপাতাল ভবনটি অনেক পুরোনো। এ কারণে জীর্ণদশা হয়েছে। ভবনটি সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছিল। সম্প্রতি ক্লিনিকের সংস্কার কাজের জন্য বাজেট পাওয়া গেছে। জুনের মধ্যেই সংস্কার কাজ শেষ হবে। গণপূর্ত বিভাগ এসব দেখাশুনা করবে।

এ ব্যাপারে রংপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ্ আল মামুন ফেস দ্যা পিপল কে বলেন, সংস্কার কাজের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহ্বান সম্পন্ন হয়েছে। খুব শীঘ্রই তিনটি কাজের চুক্তি সম্পাদন করা হবে। রং করা, পানির লাইন সংযোজন, টাইলস পরিবর্তনসহ কিছু সংস্কার কাজ করতে রয়েছে। তবে এসব করতে বেশি দিন সময় লাগবে না। অর্থবছর জুন মাসের মধ্যে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

#নেই রোগী পড়ে আছে ফাঁকা বেড
# পাঁচ বছর ধরে এক্স-রে মেশিন বিকল
# নেই মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট
# জুনিয়র কনসালটেন্ট পদ শুন্য

দেশসংবাদ/প্রতিনিধি/এফএইচ/বি


আরও সংবাদ   বিষয়:  রংপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল  


আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা
সোমবার ফাইজারের টিকা প্রয়োগ শুরু
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
সহযোগি সম্পাদক
এনামুল হক ভূঁইয়া
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
এম. এ হান্নান
সহকারি সম্পাদক
মোহাম্মদ রুবাইয়াত আনোয়ার
মেবিন হাসান
যোগাযোগ
টেলিফোন
০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবাইল ফোন
০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল
[email protected]
ফেসবুক
facebook.com/deshsangbad10

Developed & Maintenance by i2soft
logo
up