ঢাকা, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২০ || ২২ শ্রাবণ ১৪২৭
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ সিটি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করার নির্দেশ ■ ফখরুলকে যে প্রশ্ন করলেন হানিফ ■ বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা ■ তওবা করে নতুন বছর শুরু করি ■ নববর্ষে দেশবাসীকে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা ■ অবৈধদের ফেরত না পাঠানোর লিখিত আশ্বাস চায় বাংলাদেশ ■ ২০১৯ সালে কর্মক্ষেত্রে নিহত ৯৪৫ জন শ্রমিক ■ হাইকোর্টে আইনজীবী হতে এবার এমসিকিউ পরীক্ষা ■ আন্তর্জাতিক কলরেট ৬৫ শতাংশ কমাতে যাচ্ছে বিটিআরসি ■ ভারতের নয়া সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানে ■ পররাষ্ট্র সচিব হলেন মাসুদ বিন মোমেন ■ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে ঢাকায় আসছেন ম্যারাডোনা
গতিপথ বদলে মূল আঘাত পশ্চিমবঙ্গে
দেশসংবাদ ডেস্ক
Published : Sunday, 10 November, 2019 at 9:43 AM, Update: 11.11.2019 12:43:28 AM
Zoom In Zoom Out Original Text

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল

‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় বুলবুল শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হেনেছে। রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফ্রেজারগঞ্জ ও সাগরদ্বীপ হয়ে ঢুকে পড়ে সুন্দরবনের ভারতের অংশে। ঝড়ের মূল অংশ বা চোখ স্থলভাগে উঠতে লেগে যায় প্রায় ৪ ঘণ্টা। সুন্দরবনের উভয় দেশের অংশে ঝড়টি মূল অংশ রাতভর তাণ্ডব চালায়।

পশ্চিমবঙ্গে আঘাতের সময় ঝড়ের ডানদিকের অগ্রভাগ পৌঁছে যায় বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা খুলনা, পটুয়াখালী ও বরগুনা উপকূলে। মধ্যরাত নাগাদ এটি পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূল অতিক্রম সম্পন্ন করে। ফলে বাংলাদেশ-ভারতের উপকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল একরকম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। রাত ২টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ পাওয়া যায়নি। তবে ঝড়ের কারণে শনিবারের রাতটি নির্ঘুম কেটেছে বাংলাদেশের উপকূলের ৯ জেলার লাখ লাখ মানুষের।

শনিবার বিকাল ৩টায় ঝড়টির গতিবিধি ও তীব্রতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি বা বাংলাদেশ মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট) বলেছে, সাগরে থাকাকালে ১৫ কিলোমিটার বেগে এগোচ্ছিল এটি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় ঝড়টির কেন্দ্র থেকে ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার। কিন্তু এটি যতই উপকূলের কাছাকাছি আসছিল ততই এর অগ্রগতি কমছিল। সন্ধ্যা ৬টায় ঝড়টির আগানোর গতি ছিল ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার। রাত ৯টায় তা ৮ কিলোমিটারে নেমে আসে। পাশাপাশি এর বাতাসের গতি সন্ধ্যায় কমে ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার হয়। কিন্তু রাত ৯টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার হয়েছিল। এভাবে তা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হচ্ছিল। ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় রাত ১২টার মধ্যে ‘প্রবল’ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। রাত সাড়ে ১২টায় এক ব্রিফিংয়ে বিএমডি জানায়, রোববার ভোরে এটি দুর্বল হয়ে সাতক্ষীরা-খুলনা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।

তখন এটি একটি সাধারণ ঘূর্ণিঝড়রূপে থাকবে। অবশ্য ভারতীয় আবহাওয়া অধিদফতর (আইএমডি বা ইন্ডিয়া মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট) বলছে, পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার গতি ছিল এই ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের। উপকূল অতিক্রমকালে এটি প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে সরে যায়। ফলে বাংলাদেশের পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় মূল আঘাত হানতে পারেনি। তবে রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানে। এর ৫ ঘণ্টা আগে বিকাল ৩টা নাগাদ ঝড়টির অগ্রবর্তী অংশ পৌঁছে যায় পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে। স্থলভাগে উঠে ঝড়ের বড় একটি অংশ মধ্যরাতে আঘাত হানে বাংলাদেশের খুলনায়।

তবে রাত ২টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস ছিল- ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের চোখ আজ (রোববার) ভোর নাগাদ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরা-খুলনার ওপর দিয়ে এটির বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওই এলাকা অতিক্রমকালে ঘণ্টায় এর বাতাসের গতিবেগ ৭০ থেকে ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব শনিবার সন্ধ্যা থেকেই পড়েছিল গোটা উপকূলে। এ সময় বয়ে যায় প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া। এ কারণে শনিবার দুপুরেই খুলনা-বরিশাল বিভাগের ৯ জেলায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়েছিল।

এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে ছিল ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। আর কক্সবাজারে ছিল ৪ নম্বর স্থানীয় সংকেত। রাত ২টায়ও ওই সতর্কতা বহাল ছিল। উপকূলজুড়ে এখনও সতর্কতা জারি করা আছে। জনগণের জানমাল রক্ষার্থে সরকার ইতিমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বিএমডি আগেই ঘোষণা করেছিল, পূর্ণিমার জোতে এই ঝড়ের আবির্ভাবের কারণে উপকূলীয় এবং চরাঞ্চলে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়েও ৫-৭ ফুট উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। তবে সৌভাগ্যের বিষয় হলো, মূল ঝড়টি আঘাতের সময়েই ভাটা শুরু হয়েছিল। রাত ৩টার দিকে জোয়ার শুরু হয়। ততক্ষণে ঝড়ের চোখ ভারতের সুন্দরবন অংশের রায়দীঘি ও হলদিবাড়ি এলাকার মাঝখানে অবস্থান করছিল।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ভয়াবহতা ও ছোবল থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। উপকূলীয় ১৯ জেলায় দুর্যোগ মোকাবেলায় শুক্রবার রাত থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়। উপকূলীয় এলাকা থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। যদিও অনেকে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু রেখে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চায়নি। ওই অবস্থায় যারা যেতে চায়নি তাদের জোরপূর্বক ধরে নেয়ার নির্দেশনা ছিল সরকারের। জনগণকে সতর্ক করতে শনিবার সকালের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে লাল পতাকা টানানো হয়। পৌনে ৫ হাজার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি সাগরতীরের লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরে যেতে মাইকিং করা হয়। মজুদ করা হয় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১১৬ থানায় দেড় হাজার মেডিকেল টিম গঠন করে।

এর আগে শুক্রবার থেকেই সব নৌযান ও ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়। চট্টগ্রাম ও মোংলাসহ বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে পণ্য ওঠানামাও বন্ধ করে দেয়া হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সাতক্ষীরায় মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি সেখানকার ১৪ জেলায় আনসার-ভিডিপি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। কাজ করছেন পুলিশ সদস্যরাও।

৮টি কমিউনিটি রেডিও বিশেষ সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শনিবারের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা বন্ধ ছিল। আজকে কোনো পরীক্ষা নেই। কালকের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা ইতিমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। সোমবারের জেএসসি ১৩ নভেম্বর এবং জেডিসি পরীক্ষা ১৬ নভেম্বর নেয়া হবে। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপিদলীয় নেতাকর্মীদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি উভয় দল কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম খুলেছে।

শনিবার মধ্যরাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়া এবং ঘরের চালা উড়িয়ে নেয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সাগরে এবং উপকূলের নদ-নদীতে জোয়ারের পানি বেড়েছে। সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে খুলনা, বরগুনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন চর।

স্রোতের তোড়ে অনেক স্থানে ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধ। সেই ভাঙা দিয়ে পানি ঢুকে পড়ছে লবণাক্ত পানি। কোথাও ভেসে গেছে মাছের ঘের। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সাগরমুখী মাছ ধরার অনেকগুলো ট্রলার উপকূলে ফিরে আসেনি। ১৫ জন জেলে নিখোঁজ ছিল।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এ ধরনের ঝড় অনেকটা স্থানজুড়ে আঘাত হানে। বুলবুলেরও বাংলাদেশ এবং ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে আছড়ে পড়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে গতিপথ পশ্চিম দিকে সরে যায়। ওই অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের উপকূল অতিক্রম করে রাত ১১টার দিকে। যদি ঝড়ের বিদ্যমান গতি অটুট থাকে তাহলে পরে ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন হয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। রোববার ভোর ৭টার পর তা খুলনা এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছাতে পারে। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব পড়ত শুরু করেছিল। ওই এলাকায় ছিল প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া।

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়কে চার ভাগে ভাগ করা হলে এর ডানপাশে বাতাসের গতিবেগ বেশি থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেদিকই ছিল বাংলাদেশ অংশে। যে কারণে খুলনা, বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূল প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ আছে। এর সঙ্গে বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাস থাকে। সবচেয়ে আতঙ্কের হয় যদি আঘাত হানার সময়ে সাগরে জোয়ার এবং পূর্ণিমার মৌসুম থাকে। তখন জলোচ্ছ্বাস বেড়ে যায়।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, মধ্যরাতে মূল ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়তে পারে ভারতের সুন্দরবন অংশে। এর বিস্তৃতি থাকতে পারে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশসহ খুলনা, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে। এটি বাংলাদেশ-ভারতের মাঝখান দিয়ে ওঠায় সুন্দরবন একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে আমরা বেঁচে যাচ্ছি। কিন্তু সুন্দরবনের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, এরপর এটি বাংলাদেশের বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা হয়ে ত্রিপুরার দিকে চলে যাবে। পরে স্থল নিুচাপ আকারে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে এটি দুর্বল হয়ে ম্লান হবে। কিন্তু এর প্রভাব দেশের সব দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং মধ্যাঞ্চলে পড়বে। তবে এটাও ঠিক যে, ঘূর্ণিঝড়ের সার্বিক ব্যাপারে এভাবে আগাম পূর্বাভাস করা কঠিন। কেননা যেকোনো সময় এ ধরনের ঝড় গতিমুখ পরিবর্তন করতে পারে। সে কারণে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

বিএমডির উপপরিচালক আয়শা খাতুন ঘূর্ণিঝড় নিয়ে শনিবার কয়েক দফা ব্রিফিং করেন। তিনি বিকালে সাংবাদিকদের জানান, ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলাগুলো এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোয় ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড় ও পূর্ণিমার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং জেলাগুলোর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিুাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় কিছু দুর্বল হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে রাত ৯টায় পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূল অতিক্রম শুরু করে। তখন ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার ছিল, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ বাংলাদেশে আঘাত হানার আগেই ১৮ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান। শনিবার তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় ঝূকিপূর্ণ এলাকায় ইতিমধ্যে তিন লাখ লোককে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। উপকূলের ১৮ লাখ লোককে ৪ হাজার ৭১টি আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হবে। জনগণের নিরাপত্তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় দুই হাজার প্যাকেট করে খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতি প্যাকেটে একটি পরিবার সাতদিন খেতে পারবে। উপকূলীয় সাতটি জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও পিরোজপুরে দুই হাজার করে মোট ১৪ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং ১০ লাখ করে মোট ৭০ লাখ টাকা, ২০০ টন করে ১৪০০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় পাঁচ লাখ করে মোট ৩০ লাখ টাকা, ১০০ টন করে মোট ৬০০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলা ও বাগেরহাটের নয়টি জেলায় এক লাখ টাকা করে গোখাদ্য বাবদ এবং এক লাখ টাকা করে শিশুখাদ্য বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সংশ্লিষ্ট ১৩টি উপকূলীয় জেলা ও এর অন্তর্ভুক্ত উপজেলায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা-উপজেলায় এ বিষয়ে সতর্কতামূলক প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। উপকূলীয় ১৩টি জেলায় সাতটি জোনের ৪১টি উপজেলার ৩৫০টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৬৮৪টি ইউনিটে মোট ৫৫ হাজার ৫১৫ জন স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার শুরু হয়েছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সরকারের সব দফতরকে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান।

সারা দেশের নৌযান চলাচল বন্ধ

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর প্রভাবে সৃষ্ট বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সারা দেশে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে সীমিত পরিসরে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল করার পর তা বন্ধ করে দেয়া হয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শনিবার বিআইডব্লিউটিএতে জরুরি বৈঠক করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, উদ্ধারকারী জাহাজগুলোয় প্রয়োজনীয় রশদসহ প্রস্তুত রাখা, সংস্থার ড্রেজারসহ অন্যান্য নৌযান নিরাপদে রাখা, টার্মিনালগুলোতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে জনসাধারণকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব-উল ইসলাম বলেন, শনিবার সারা দেশে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। গাড়ি ও দূরপাল্লার যাত্রীদের সুবিধার্থে শনিবার কিছু সময় শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় অল্পসময়ের জন্য সীমিত আকারে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল করেছিল। তিনি বলেন, নৌবন্দরগুলোর আকার অনুযায়ী টিম গঠন করা হয়েছে। তারা যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসন ও জনসাধারণকে সহায়তা করবে।

নৌমন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থাগুলোর ছুটি বাতিল

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর প্রভাবে জরুরি দুর্যোগ মোকাবেলায় সার্বিক যোগাযোগের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় শনিবার একটি অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম খুলেছে। কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্বর ০২-৯৫৪৬০৭২। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনোজ কান্তি বড়াল কন্ট্রোল রুমের সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার প্রস্তুতিসহ পরবর্তী প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম নিতে নৌমন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ দফতরগুলোর সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৯ ও ১০ নভেম্বরের সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়েছে। শনিবার পৃথক দুটি অফিস আদেশে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বাগেরহাট, মোংলা ও শরণখোলা

শনিবার সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি দেখা যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্রতাও বাড়তে থাকে। মোংলা বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি ১৪টি জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকেই বন্ধ রাখা হয় বন্দরের কার্যক্রম। নৌবাহিনীর ৪টি জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। একই সঙ্গে সুন্দরবন উপকূলের ১০টি পয়েন্টে প্রস্তুত আছেন কোস্টগার্ড সদস্যরা। ইতিমধ্যে দুবলার চরে রাসমেলায় থাকা পর্যটকদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শত শত মাছ ধরা নৌকা ও ট্রলার সুন্দরবন উপকূল ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট ও সাড়ে ৪ টন চাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলায় ২৩৪টি আশ্রয় কেন্দ্র, ১০টি মেডিকেল টিম ও ১০টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

খুলনা

শনিবার দিনভর বৃষ্টি ছিল। সেই সঙ্গে হালকা ঝড়ো হাওয়া শুরু হয় বিকাল থেকে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, সাতটি উপজেলায় ৩৪৯টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এতে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৫০ জন মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে বিপদাপন্ন ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৫ জন মানুষকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজসহ উঁচু স্থাপনায় অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র করে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন জানিয়েছেন, এরই মধ্যে সাতটি উপজেলার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে আহ্বান জানানো হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের প্রায় ৬ হাজার সদস্যসহ ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৎপর রয়েছে। পর্যাপ্ত শুকনো খাবারও মজুদ রাখা রয়েছে। এছাড়াও নগদ অর্থ, ওষুধ এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়।

চট্টগ্রাম

৯ নম্বর বিপদ সংকেত জারির পর চট্টগ্রামের ৬টি উপকূলীয় উপজেলার লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে মাইকিং করছে প্রশাসন। চট্টগ্রামের সরকারি সব বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিজ নিজ স্টেশনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলায় ৪৭৯টি স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার এবং প্রায় চার হাজার স্কুল-কলেজের পাকা ভবন উপকূলের বাসিন্দাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য শুক্রবারই প্রস্তুত করা হয়। এছাড়াও সম্ভাব্য দুর্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা জিআর ক্যাশ, ৩৪৯ টন জিআর চাল, ৬৮১ বান্ডেল ঢেউটিন, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৫০০ তাঁবু প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলায় ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, আমরা তিন হাজারের মতো লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে এসেছি।

পিরোজপুর, ভাণ্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া ও কাউখালী

শুক্রবার রাত থেকেই বৃষ্টি ও হালকা বাতাস বইতে শুরু করে। জেলা প্রশাসকের অফিসসহ জেলার ৭টি উপজেলায় ৭টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। ১৬৯টি মেডিকেল টিম, ২২৮টি সাইক্লোন সেন্টার ও আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শনিবার রাত ৭টা পর্যন্ত এসব আশ্রয় কেন্দ্রে অন্তত ৮২ হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া ১১ লাখ ৯০ হাজার নগদ টাকা এবং ৩৫০ টন শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা শহর ও প্রতিটি উপজেলায় রেডক্রিসেন্টের সদস্যরা মাইকিংয়ে মহাবিপদ সংকেত বার্তা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ বার্তা প্রচার করেন। এদিকে কাউখালীতে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উপজেলার নিুাঞ্চল ইতিমধ্যেই ২-৩ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। বেড়ি বাঁধ না থাকায় উপজেলার ৫০ হাজার মানুষ জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং শতাধিক একর জমির আমন ফসল ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন কৃষকেরা।

শরীয়তপুর

শনিবার সকাল ৮টা থেকে শরীয়তপুর-ঢাকা-শরীয়তপুর-চাঁদপুর রুটের ফেরিসহ সব নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক ও বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনাল থেকে চলাচলকারী সাতটি রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরকে ১ নম্বর হুশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর।

বরগুনা, তালতলী, দক্ষিণ, পাথরঘাটা ও আমতলী (বরগুনা)

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, বরগুনায় ৩৪১টি সাইক্লোন শেল্টারসহ ৫০৯টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। যেখানে ৫ লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।

যারা আশ্রয় নিয়েছেন তাদের জন্য দুপুরে খিচুড়ি ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা আছে। পাথরঘাটা থেকে ১শ’ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের নারিকেলবাড়ীয়া এলাকায় বৃহস্পতিবার এফবি তরিকুল নামে মাছ ধরা একটি ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এ ঘটনার পর গত ২ দিনেও ওই ট্রলারের ১৫ জেলেসহ ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এদিকে শনিবার সকাল থেকে ছিল ভারি বর্ষণ। উপকূলীয় চরাঞ্চলের বহু মানুষ সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে।

সাতক্ষীরা

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে দিনভর ছিল দমকা হাওয়া। থেমে থেমে এ হাওয়া ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। সন্ধ্যার আগেই উপকূলীয় এ জেলায় অন্ধকার নেমে আসে। দুপুরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণার পর থেকে জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে গ্রামবাসীকে সরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে সকাল থেকেই। তবে বৃষ্টির কারণে তা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। গ্রামবাসী তাদের বাড়িঘর ছাড়তে রাজি হননি। অনেককে জোর করেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনা হয়েছে। সুন্দরবন এলাকার নদ-নদীতে পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুন্দরবন থেকে জেলে মাঝি বাওয়ালি ও শ্রমিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

বরিশাল ও বানারীপাড়া

বুলবুল আতঙ্কে দিশেহারা বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। এর প্রভাবে গোটা বরিশাল বিভাগজুড়েই বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। কখনও মাঝারি, কখনও ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে সব নৌযান। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভাগের ২ হাজার ৪শ’ আশ্রয় কেন্দ্রে সাড়ে ৮ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। তবে, এখনও অনেকেরই নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে অনীহা রয়েছে। তাদের বুঝিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানোসহ সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। গ্রামীণ জনপদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলছে দফায় দফায় মাইকিং। লাল নিশান উড়িয়ে সতর্ক করা হচ্ছে মানুষদের। বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে শুকনো খাবার ও খিচুড়ি রান্না করে বিতরণ করা হয়েছে। বরিশাল জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া তথ্য মতে, শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত জেলার ২৩২টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৫০ হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে, দুর্যোগ পরবর্তী জরুরি সেবা দেয়ার জন্য ৩১৭টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া বিভাগের সব জেলার সংশ্লিষ্ট সব দফতরগুলোকে যথাযথ ব্যবস্থ নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যার পরেই বরিশাল থেকে যাত্রীবাহী সব লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে বিআইডব্লিউটিএ। এতে রাজধানীমুখী বা বরিশালগামী যাত্রীরা বেশ ভোগান্তিতে পড়েন। শনিবার বন্ধ করে দেয়া হয় সব ধরনের নৌযান চলাচল।

মানিকগঞ্জ ও গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)

পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া নৌপথে লঞ্চ চলাচল শনিবার দুপুর থেকে বন্ধ রয়েছে। একই সময়ে মানিকগঞ্জের আরিচা ও পাবনার কাজীর হাট নৌপথে লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিকালের পর থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে সীমিত আকারে ফেরি চলাচল করে।

লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ)

শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ও মাঝিকান্দি নৌ-রুটের পদ্মায় লঞ্চ, সি-বোট ও ট্রলার চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে এ নৌরুটের ১৭টি ফেরির মধ্যে চলাচল করছে রোরো ফেরি শাহপরান, কেটাইপ ফেরি কপোতী, কুমিল্লা, ক্যামেলিয়া, ফরিদপুর ও ড্রাম ফেরি রামশ্রী, যমুনা, রানীক্ষেতসহ ৮টি ফেরি। শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ী ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ সহস্রাধিক যানবাহন।

ভোলা ও মনপুরা

নিুাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও ৮৬ হাজার গবাদি পশুকে মুজিব কেল্লায় রাখা হয়েছে। শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় ভোলা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জেলায় ৬৬৮টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ৯২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এবং ৮টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এছাড়াও উপকূলে সিপিপি ও রেড ক্রিসেন্টর ১৩ হাজারেরও বেশি কর্মী কাজ করছেন। সবাইকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হলেও অনেক জেলেকে মহাবিপদ সংকেত উপেক্ষা করে মেঘনায় মাছ ধরতে দেখা গেছে।

পটুয়াখালী, গলাচিপা, কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী, মির্জাগঞ্জ ও কুয়াকাটা

সাগরে মাছ শিকাররত জেলেদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ফিরে এলেও অনেকেই এখন পর্যন্ত সাগরে রয়েছেন। কলাপাড়া উপজেলায় ললুয়া ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। গলাচিপা উপজেলায় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সবচেয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। এ সময় গাছ থেকে ধানের শীষ বের হয়। সব ধান চিটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। রাঙ্গাবালী উপজেলার আশ্রয় কেন্দ্র না থাকা ১২টি চর এলাকা। তবে দুর্যোগ মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় প্রশাসন। মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় উপজেলায় ৪২টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একাধিক মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং উপজেলার সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মহিপুর থানা ও কুয়াকাটা টুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যটকদের কুয়াকাটা ত্যাগ করতে এক রকম বাধ্য করা হচ্ছে। সৈকতের বেলাভূমি থেকে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। শনিবার বিকালে গঙ্গামতি সৈকত থেকে একটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মৎস্য বন্দর আলীপুরের আনোয়ার খানের এফবি ফেরদাউস ট্রলারের ১৯ জেলেসহ মাছ ধরার ট্রলার নিখোঁজ রয়েছে।

ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর)

ফরিদগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।

কালকিনি (মাদারীপুর)

কালকিনি উপজেলায় শুক্রবার সকাল থেকে থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আর আকাশে প্রচুর মেঘ থাকায় অন্ধকারাছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সচেতনতায় ঘূর্ণিঝড় থেকে বাঁচতে সব কৃষকদের উদ্দেশে বিশেষ সতর্ক বার্তা জারি করেছেন।

কেশবপুর (যশোর)


কেশবপুরে ভারি বৃষ্টির সঙ্গে দমকা বাতাসে আমন ধান, শাক-সবজি, সদ্য বপনকৃত শস্য ও মুসুরির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

গোলাপগঞ্জ (সিলেট)

গোলাপগঞ্জ উপজেলায় যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা।

মেহেরপুর

সবজি চাষের বীজতলা বাঁচাতে সদর উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামের মাঠে সবজি চাষের বীজতলা পলিথিনে ঢেকে দিয়েছেন কৃষক।

রামগতি (লক্ষ্মীপুর)

রামগতি ও কমলনগরে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার পৃথকভাবে উপজেলা প্রশাসন এ সভার আয়োজন করে।

কাশিয়ানী (গোপালগঞ্জ)

বৃষ্টির পানিতে কাদায় একাকার রাস্তাঘাট। আগাম শীতকালীন সবজি ও আমনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষীরা।

নোয়াখালী

হাতিয়ার সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর মেইন ভূখণ্ডের সব নৌ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৬৪টি সাইক্লোন সেন্টার। বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা নদী ভয়াল উত্তাল হয়ে উঠেছে।

মহেশখালী (কক্সবাজার)

মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় শনিবার সারা দিন বৃষ্টি ছিল। সাগর উত্তাল থাকায় দ্বীপের সঙ্গে নৌ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

দেশসংবাদ/জেনি/এফএইচ/mmh


আরও সংবাদ   বিষয়:  পশ্চিমবঙ্গ   অতি প্রবল   ঘূর্ণিঝড়   বুলবুল  




আপনার মতামত দিন
আরো খবর
করোনা আপডেট
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
ফাতেমা হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft
logo
up