ঢাকা, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০ || ১৪ চৈত্র ১৪২৬
শিরোনাম: ■ করোনার গুজব নিয়ে যে সতর্কবার্তা দিলো সরকার ■ সময় ফুরাবার আগেই চিন্তা করতে হবে কোন পথে হাঁটবো? ■ করোনায় আক্রান্ত জাতিসংঘের ৮৬ কর্মী ■ ব্রিটেনে ২৪ ঘণ্টায় ২৬০ জনের মৃত্যু ■ করোনা পরীক্ষার কিট তৈরি করলেন ভারতীয় নারী! ■ আকিজের হাসপাতাল বানানোর খবরে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ ■ সারা বিশ্বেই সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে মানুষ ■ বাংলাদেশ থেকে ২৫ মেডিক্যাল আইটেম নেবে যুক্তরাষ্ট্র ■ সুস্থ হয়ে আবারও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে চীনে ■ নিউইয়র্কে করোনায় আরও ৪ বাংলাদেশির মৃত্যু ■ যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের সহায়তার প্রস্তাব ■ সেই বিতর্কিত এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসানকে প্রত্যাহার
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কায় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল
দেশসংবাদ, ঢাকা
Published : Tuesday, 24 March, 2020 at 2:08 PM

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল

‘যার কাজ তার সাজে, অন্য লোকে দ্বন্দ্ব বাজে’ প্রবাদটি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের রাজস্ব আদায়ের সহযোগিতাকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় মেয়র মোহাম্মদ হানিফ স্মৃতি সংসদের সভাপতি মো. মানিকের ক্ষেত্রে যেন যথার্থই হয়েছে। অস্বচ্ছভাবে তাকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ থাকলেও তিনি আবার তার নিয়োগপত্রে দেয়া ক্ষমতা অপর এক ব্যক্তির কাছে ঠিকাচুক্তিতে বিক্রি করে দেন। অথচ সিটি কর্পোরেশনের এই ক্ষমতা অন্য কারো কাছে হস্তান্তরযোগ্য নয়।

এখানেই শেষ নয় কিছুদিন যেতে না যেতেই মানিক তার নিয়োগপত্রে দেয়া ক্ষমতা আবারো অপর এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। যার ফলে রাজস্ব আদায় নিয়ে সায়দাবাদ টার্মিনালে যে কোনো সময় ঘটতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হতে পারে প্রাণহানি। জানা গেছে, রাজস্ব আদায়ের সহযোগিতাকারী হিসেবে মো. মানিককে গত বছরের ২৮ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে অবস্থানরত বিভিন্ন পরিবহন থেকে নির্দিষ্ট হারে টোল (রাজস্ব) আদায়ের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ অনুসারে ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজস্ব আদায়ের সহযোগী হিসেবে কাজ করবেন মো. মানিক, যার স্মারক নং ৪৬.২০৭.০০২.১৬.০৩.৮৫.২০১৯।

রাজস্ব আদায়ের সহযোগী হিসেবে নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী মানিককে দশ লাখ ৩৫ হাজার ২৫০ টাকা জামানতসহ দৈনিক ৬৮ হাজার ৭৫০ টাকা হারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব তহবিলে জমা দিতে হবে। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী মানিক তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টার্মিনাল থেকে টোল আদায় করে প্রতিদিন সকাল ১০টার মধ্যে কর্পোরেশনের পরিবহন দফতরে ৬৮ হাজার ৭৫০ টাকা হারে জমা দেবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি অদক্ষ হওয়ায় নিয়োগ পাওয়ার পর ডিএসসিসির নিয়োগের দেয়া শর্ত ভঙ্গ করে তার এই ক্ষমতা কামাল হোসেন নামে এক পরিবহন শ্রমিক নেতার কাছে তিন শত টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তিপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করে দেন। এ চুক্তিপত্র আবার ২০ ফেব্রæয়ারি আইনজীবী দ্বারা নোটারি পাবলিক করা হয়।

তাদের মধ্যে হওয়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী মানিকের সঙ্গে ডিএসসিসির নিয়োগপত্রে উল্লিখিত সব টাকা পরিশোধের পর দৈনিক ৮ হাজার টাকা করে মানিককে অতিরিক্ত দেবেন কামাল। জামানতের পুরো টাকা পরিশোধের পরও মানিক আবারো ১০ লাখ টাকা ধার হিসেবে নেন। এ ছাড়া মো. বাচ্চুর দেয়া মামলার সুরাহা করতে কামালকে দিয়ে মানিক আরো প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ করায়। অর্থাৎ মো. মানিক সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে টোল আদায়ের ক্ষমতা হস্তান্তর করে মো. কামালের থেকে সর্বমোট প্রায় ২৮ লাখ টাকা লুফে নেন বলে জানা গেছে।

কিন্তু এখানেই ক্ষান্ত হননি মো. মানিক, পরবর্তীতে সায়েদাবাদ টার্মিনালে টোল আদায়ের তার এ নিয়োগের ক্ষমতাকে চলতি বছরের ৪ মার্চ আবারো বিক্রি করেন টার্মিনালের ত্রাস খ্যাত মো. বাচ্চু মিয়ার কাছে। পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অজুহাত দেখিয়ে মো. কামাল হোসেনকে দেয়া সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে টোল আদায়ের ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন মর্মে গত ৩ মার্চ ওয়ারী জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার বরাবর আবেদন করেছেন মো. মানিক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের এক ব্যবসায়ী বলেন, উলুবনে মুক্তা ছড়ালে যা হয়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ স্মৃতি সংসদের সভাপতি হওয়ার সুবাদে মো. মানিককে টার্মিনালের রাজস্ব আদায়ের নিয়োগ দেয়া হয়। যদিও তার এ নিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। এমনকি মো. মানিককে নিয়োগ দেয়ায় মো. বাচ্চু মিয়া আদালতের শরনাপন্ন হলেও পরবর্তীতে মানিকের সাথে আপস মীমাংসা হয় এবং মো. কামালের কাছে টার্মিনালের টোল আদায়ের ক্ষমতা বিক্রি করায় তার মাধ্যমেই বাচ্চু মিয়াকে কিছু টাকা দিয়ে মামলার সুরাহা করানো হয়। কিন্তু এখন আবার শুনছি টার্মিনালের দায়িত্ব মো. বাচ্চু মিয়াকে দিয়েছে মো. কামাল।

এদিকে সায়েদাবাদ টার্মিনালে টোল আদায় বর্তমানে কামাল হোসেন করলেও এ নিয়ে বাচ্চু মিয়া মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে কামাল হোসেন ও বাচ্চু মিয়ার মধ্যে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষসহ প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। এ নিয়ে এরই মধ্যে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মহা ব্যবস্থাপকের (পরিবহন) অফিসে তার উপস্থিতিতে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এখনো কোনো সুষ্ঠ সমাধান হয়নি বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কামাল হোসেন বলেন, মানিক টোল আদায়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর সেটা আমার কাছে বিক্রি করে। কথা ছিল কর্পোরেশনের সব টাকা পরিশোধ করার পর তাকে আমি দৈনিক ৮ হাজার টাকা করে দেব। আমি এ পর্যন্ত এই টার্মিনাল খাতে মোট ২৮ লাখ টাকা ব্যয় করি। কিন্তু এখনো কোনো আয় করার সুযোগ হয়নি। এ অবস্থায় সে আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করে টার্মিনালটি অরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেয়। এখন ওই ব্যক্তি টার্মিনাল দখলের জন্য নানাভাবে চক্রান্ত করছে।

বিষয়টি সম্পর্কে মো. মানিক বলেন, কামালকে দায়িত্ব দেয়ার পরে তিনি আমাকে দৈনিক যে টাকা দেয়ার কথা তা ঠিকভাবে দিত না এবং আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করত তাই তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। তবে সিটি কর্পোরেশনে দৈনিক যে টাকা জমা দেয়ার কথা তা সে ঠিকভাবে জমা দিত। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পরিবহন বিভাগের বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপক (অ.দা.) গোলাম মোর্শেদের কথা অনুসারেই কামালের সাথে এ চুক্তি করি। গোলাম মোর্শেদ সবই জানেন। মানিক আরো বলেন, বাচ্চু হত্যা মামলার আসামি তা আমার জানা ছিল না। পরক্ষণেই বলেন, বাস টার্মিনাল ভালো মানুষ পরিচালনা করতে পারেন না।

এ ব্যাপারে মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, টার্মিনালের টোল আদায়ের ব্যাপারে আমার সাথে মো. মানিকের কোনো চুক্তিপত্র হয়নি, তবে তার হয়ে আমি টোল তুলব এবং তিনি আমায় মাসওয়ারী বেতন দেবেন।  বেতনের পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি জানান, হবে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

বিভিন্ন মামলা থাকার কথা স্বীকার করে অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ নেতা সাগরকে আমি হত্যা করিনি। প্রসঙ্গত, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে টোল আদায়ে সহযোগী হিসেবে সিটি কর্পোরেশনের দেয়া নিয়োগের ক্ষমতা অন্য কারো কাছে হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু কোন আইনিবলে এ ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো এবং বিষয়টি জানার পরও ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগ ব্যবস্থা না নিয়ে আপস মীমাংসার জন্য কেনই বা দফায় দফায় বৈঠক করলেন। এসব জিজ্ঞাসা সচেতন মহলের।

ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) নিতাই চন্দ্র সেনের কার্যালয়ে রোববার চার দফা গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি এবং পরবর্তীতে বিকেল ৫টার পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অপরপ্রান্ত থেকে ফোন রিসিভ হয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবহন বিভাগের এক সূত্র জানায়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের বিবাদমান দুই গ্রুপ পরিবহন মহাব্যবস্থাপকের কাছে এসেছিলেন। তিনি তাদের বলেছেন বর্তমানে টার্মিনাল যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে। কারণ টার্মিনালের বিষয় পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই নতুন করে ঝামেলার সৃষ্টি হোক তা চাই না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পরিবহন মহাব্যবস্থাপক নিতাই চন্দ্র সেন।

এ ব্যাপারে ব্যবস্থাপক বাস টার্মিনাল গোলাম মোর্শেদ বলেন, আমি এসব চুক্তপত্রের বিষয় কিছুই জানি না। শুধু জানি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের রাজস্ব আদায়ের সহযোগী হিসেবে মো. মানিককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং তার পক্ষে এ কাজ করছে মো. কামাল হোসেন শওকত।

অভিযোগ রয়েছে, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের গডফাদার টিটু মুন্না ১৯৯৬ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর তার মুক্তির জন্য ঢাকা থেকে রামগঞ্জগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে বাচ্চু ও তার সহযোগী জাফর, সেন্টু ও গণি-গংরা পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় ১৩ জন যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। এর মধ্যে গণি বাসে আগুন দিতে গিয়ে নিজেও পুড়ে মারা যায়।

সেন্টুর পায়ে আগুন লাগলে সে বাস থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়ে। ’৯৬ সালে ওই ঘটনার পর কিছুদিন পালিয়ে থাকার পর সেন্টু আবার টার্মিনালে ফিরে আসে। এ ছাড়া তিনি আলোচিত ঢাকা এক্সপ্রেস পরিবহনের মালিক নাসির উদ্দিন তোহা, ছাত্রলীগ নেতা সাগর ও টার্মিনালের শ্রমিকপ্রিয় নেতা খায়রুল মোল্লা হত্যা মামালাসহ একাধিক হত্যা, গাড়ি পোড়ানোসহ বিভিন্ন নাশকতা মামলার আসামি।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানান, বাচ্চু ও তার সহযোগীরা সায়েদাবাদ টার্মিনালে উত্তরবঙ্গগামী বাস থেকে পরিবহন শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিলের জন্য ৪০ টাকার পরবর্তীতে ৪শ’ থেকে ৮শ’ টাকা পর্যন্ত দৈনিক চাঁদা আদায় করেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

দেশসংবাদ/এসএম/এফএইচ/mmh


আরও সংবাদ   বিষয়:  সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল   মেয়র মোহাম্মদ হানিফ স্মৃতি সংসদ   মানিক  



মতামত দিতে ক্লিক করুন
আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
English Version
More News...
সম্পাদক ও প্রকাশক
এম. হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
এনামুল হক ভূঁইয়া
যোগাযোগ
ফোন : ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবা : ০১৭১৩ ৬০১৭২৯, ০১৮৪২ ৬০১৭২৯
ইমেইল : [email protected]
Developed & Maintenance by i2soft