Published : Wednesday, 1 October, 2025 at 11:54 PM
খালেকুজ্জামান চৌধুরী
ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ন্যায় সিরিয়াল ব্রেক করে এবং বুয়েট থেকে পাস করা একাধিক মেধাবী প্রকৌশলীদের টপকে শত কোটি টাকা নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। পিএইচডি ডিগ্রি জালিয়াতি-সহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
খালেকুজ্জামান ছাত্র জীবনে কুয়েট থেকে লেখাপড়া করছেন বিধায় তিনি এখন গণপূর্তের কুয়েট, চুয়েট ও রুয়েট নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিভেদ সৃষ্টি করে গণপূর্ত অধিদপ্তরে একটি নৈরাজ্য সৃষ্টি করে হলেও প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর শহীদুল্লাহ খন্দকারের আশীর্বাদপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৫তম ব্যাচের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ২০১৪ সালে পিএইচডি ডিগ্রি জলিয়াতে ধরা পড়ে শাস্তির বদলে পেয়েছেন পাবনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে প্রাইস পোস্টিং। সর্বশেষ খালেকুজ্জামান চলতি বছরের ২৪ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের এক আদেশে তাকে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনের’ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে আবারও প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নেন। গণপূর্ত মেট্টোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হচ্ছে না।
ঠিকাদার ও ঢাকা শহরে একাধিক ওর্য়াকিং ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে শত কোটি টাকা কালেকশন করে প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে তিনি মাঠে সক্রিয় থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সচিবালয়ে তোড়জোড় শুরু করছে বলে একাধিক সুত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শামীম আখতার চলতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর চাকুরী হতে অবসরে যাবেন। আর এই অবসর যাওয়ার দিন যত এগিয়ে আসছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তিন শিবিরে বিভক্ত হচ্ছেন। এক গ্রুপে ১৫তম ব্যাচের ড. মঈনুল ইসলাম সিরিয়ালে প্রথম অবস্থানে রয়েছেন, ১৫তম ব্যাচের মোঃ আবুল খায়ের ২য় অবস্থানে রয়েছেন এবং ১৫তম ব্যাচের টাকার কুমিরখ্যাত খালেকুজ্জামান চৌধুরী ৩য় অবস্থানে রয়েছেন। বুয়েটের মেধাবী প্রকৌশলীদের টপকে প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য ১০০ কোটি টাকার মিশনে নেমেছেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। আর এই টাকা কালেকশনের মূল দায়িত্ব পালন করছেন সাভার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ বদরুল আলম। খালেকুজ্জামান চৌধুরীর পছন্দের ঠিকাদারী সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে ফিল্ড লেভেলে কাজ করছেন বদরুল আলম।
অনুসন্ধানে জানা যায় চাকরি জীবনে খালেকুজ্জামা চৌধুরীর বড় সময় কেটেছে অস্ট্রেলিয়ায়। স্ত্রী-সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় থাকায় সেখানে তিনি বহুবার যাতায়াত করেন। শিক্ষা ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যান, পিএইচডি এর নাম করে দফায় দফায় ছুটি বাড়িয়েছেন তিনি। অনুমোদনবিহীন ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া তে চাকুরিও করেছেন। ফিরে এলে তার বিরুদ্ধে ডিজারশনের মামলা হবার কথা।
ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি সার্টিফিকেট জালিয়াতি কান্ডে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে লঘুদণ্ড আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তাঁর বেতন স্কেলও এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।
এরপর গোপালগঞ্জের বাসিন্দা সাবেক পূর্তসচিব শহীদ উল্লা খন্দকারকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে ম্যানেজ করে ফেলেন তিনি। তাকে দায়মুক্তি দিতে শহীদুল্লাহ খন্দকার নতুন ফন্দি আঁটে। পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের জ্যেষ্ঠতা স্থগিত রাখার সুপারিশকে পাশ কাটাতে তিনি তৎকালীন দুদক কমিশনার মোজ্জাম্মেল হক খানের চাপ রয়েছে মর্মে গুজব ছড়িয়ে দেন। শহীদুল্লাহ খন্দকার শেখ হাসিনা ছাড়া কারো কথায় পাত্তা দিতেন না, এমনকি নিজের মন্ত্রীদেরকেও তিনি থোড়াই কেয়ার করতেন।
শাস্তি প্রত্যহারের সাথে সাথেই ২০১৫ সালে পেলেন পাবনা গণপুর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রাইজ পোস্টিং। সে সময় রুপপুর পারমানবিক বিদুৎ প্রকল্পের গ্রিন সিটি নির্মান কাজের দরপত্রগুলো তিনিই আহবান করেন। সে সময় টেন্ডার বানিজ্য করে জিকে শামীম গং দের সাথে শত কোটি টাকা ভাগাভাগি করেছেন তিনি।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব রয়েছে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়ি ভেঙ্গে কুখ্যাত হওয়া, মাজিদ এন্ড সন্সের মালিকের সবচেয়ে আস্থার প্রকৌশলী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এভাবে সাজিন কন্সট্রাকশন, তমা কন্সট্রাকশন কে অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ করে দিয়ে শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন। পরে অবশ্য অতিউচ্চ পার্সেনটেজ দাবি করায় প্রধান প্রকৌশলী টিপু মন্সী তাকে চুয়াডাঙ্গা বদলী করতে বাধ্য হন। এরপর লিয়েন নিয়ে নানা জায়গায় কাটিয়ে আবারো শেখ পরিবারের আশীর্বাদে খুলনা জোনে পোস্টিং পান। সেখানে শেখ হেলাল পরিবারের কথা মতো কাজ দিয়েছিলেন।
ঠিকাদারদের কাছ থেকে একাউন্টের মাধ্যমে টাকা পেলেই সিএস অনুমোদন, প্রাক্কলন অনুমোদন ও যাবতীয় নথিপত্র দ্রুত সাইন করে দেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী।
রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের শুরুতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে কঙ্কালসার হয়ে যায় গ্রিন কোজি কটেজ। সাততলার এই বাণিজ্যিক ভবনে ওই বছর প্রাণ হারিয়েছিল ৪৬ জন; দগ্ধ ও আহত হয় আরও ১৩ জন। ঘটনার রেশ কাটার আগেই রাজধানীজুড়ে হোটেল রেস্তোরাঁগুলোয় সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি করপোরেশন। গ্রেপ্তার করা হয় আট শতাধিক মানুষকে। জনমনে প্রশ্ন ওঠে, গ্রিন কোজি কটেজে থাকা রেস্তোরাঁগুলোতে প্রতিদিন যেখানে অসংখ্য মানুষ ভিড় করত, সেই ভবনের নকশার এমন করুণ দশা কেন? ভবনটিতে কোনো জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না কেন? ভবনে চলাচলের সিঁড়িটাই-বা এত সরু কেন? জরুরি নির্গমন পথ থাকলে বা সিঁড়িটা প্রশস্ত হলে তো এত প্রাণহানি হতো না।
কার অঙ্গুলি হেলনে ভবনটির নকশার অনুমোদন পায়? পত্রপত্রিকা মারফত খবর আসে, গ্রিন কোজি কটেজের নকশার অনুমোদন দিয়েছিলেন রাজউক কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ২০১১ সালে রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি ভবনটির অনুমোদন দেন। সে সময় খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে নিয়ে ব্যাপক শোরগোল চললেও একপর্যায়ে থেমে যায়।
রাজউক সূত্রে জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০১১ সালে খালেকুজ্জামান অথরাইজড অফিসার প্রেষণে রাজউকে আসেন। সে সময় বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নকশার অনুমোদন দেন তিনি। জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা না থাকা, সরু একটিমাত্র সিঁড়িসহ নানা অনিয়মে পূর্ণ ছিল নকশাটি। গনভবনের আশীর্বাদ প্রাপ্ত এই কর্মকর্তা চাকুরি বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বার বার শাস্তির বদলে পেয়েছেন পুরস্কার। অথচ এখন তিনি সবচেয়ে বড় ছাত্রদল (সাবেক) নেতা সাজছেন। সুযোগ বুঝে ভোল পালটানো এই কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ঠিকাদার -অফিসারদের নিয়ে একটি লগ্নিকারী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিণ্ডিকেটটির সাথে তার গোপন সমঝোতা হয়েছে প্রধান প্রকৌশলী হলে বদলী /টেণ্ডার বানিজ্যের সিন্ডিকেট তাদের হাতে থাকবে। বিনিময়ে তারা তার প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পথ সুগম করতে যা কিছু দরকার করবে।