Published : Saturday, 1 November, 2025 at 12:02 PM
ফাইল ছবি
শুধু ঢাকা নয়, দেশের সব এলাকায় ছড়িয়েছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিস্তার। ক্যালেন্ডারের হিসাবে ডেঙ্গুর মৌসুম শেষ হলেও বাস্তবতা বলছে, দিন দিন বাড়ছে এর ভয়াবহতা। প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। একই সঙ্গে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।
প্রতি বছর শীতের মৌসুমে বিশেষ করে অক্টোবরে কিছুটা প্রকোপ কমলেও এবার তা ভিন্ন পরিস্থিতি। কারণ অক্টোবরের ৩১ দিনে প্রাণ গেছে ৮০ জনের। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৫২০ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের যেকোনো মাসের চেয়ে মৃত্যু ও আক্রান্তের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ। এর আগের মাস সেপ্টেম্বরে মারা যান ৭৬ জন এবং আক্রান্ত হন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন। আর সব মিলিয়ে ডেঙ্গুতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ২৭৮ জনের এবং আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৮৬২ জনে। ডেঙ্গুর ছোবলে এ সংখ্যার গ্রাফ এখনও উঠতির দিকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় ডেঙ্গু রোগী শুধু শহরের মধ্যে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়েছে। আর এখন ডেঙ্গুর রোগের মৌসুম নেই। কিন্তু বছরব্যাপীই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। যদি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে শীতকালেও ডেঙ্গু প্রকোপ বাড়তে পারে।
কারণ মশা নির্মূলের কার্যক্রম সীমিত এবং সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন হয়েছে জানিয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু এখনও দেশের জন্য একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যা। কারণ এখনও হাসপাতালে যে হারে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন, এবারের শীতেও এ ধারাবাহিকতা চলতে পারে। তাই সারা বছরই সচেতন থাকতে হবে। আর জ্বর হলে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। অবশ্যই ডেঙ্গু পরীক্ষা করার পরামর্শ তাদের।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, অফিস-আদালত, হাসপাতালে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফগার ও স্প্রে মেশিন দিয়ে রাস্তা ও অলিগলিতে ধোঁয়া দেওয়া হচ্ছে, কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে, লার্ভা শনাক্ত করে ধ্বংস করা হচ্ছে। খাল ও নালা পরিষ্কার করা হচ্ছে। হটলাইন নম্বরে ফোন করে মশার উপদ্রবের অভিযোগ জানানো হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো বাড়ির মালিক বা ভাড়াটের অবহেলায় কোথাও জমে থাকা পানিতে লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানাও করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, মশার বংশবিস্তার এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী।
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যুও ঘটছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানও সেই তথ্যও দেখাচ্ছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গুতে এ বছর মোট ২৭৮ জনের মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। এখানে মৃত্যু হয়েছে ১৩৪ জনের। এর পরেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৪১ জন, বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৫ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১২ জন, রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৪ জন এবং সিলেট বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১ জন। তবে রংপুর বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) কারও মৃত্যু হয়নি।
আক্রান্তের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে ১৭ হাজার ২৪১ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১১ হাজার ৫৪৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১০ হাজার ১৯২ জন, ঢাকা উত্তর সিটিতে ৯ হাজার ৭১২ জন, চট্টগ্রামে ১০ হাজার ৯২ জন, রাজশাহীতে ৪ হাজার ২৯৮ জন, খুলনায় ৩ হাজার ৫৪৩ জন, ময়মনসিংহে ২ হাজার ২০৩ জন, রংপুরে ৭৯৪ জন এবং সিলেটে ২৩৯ জন।
অধিদফতরের পরিসংখ্যান মতে, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের হার ৬২ শতাংশ এবং নারীর আক্রান্তের হার ৩৮ শতাংশ। আবার এ সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মধ্যে পুরুষের মৃত্যুহার ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং নারী মৃত্যুহার ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ আক্রান্ত ও মৃত্যুহারে পুরুষ এগিয়ে। এ ছাড়া সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সি রোগীদের। এ মৃত্যুর সংখ্যা ৩৭ জন, যার হার ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এর পরেই ৩২ জন রয়েছে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সি রোগীদের, যার হার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে সবচেয়ে কম একজনের মৃত্যু হয়েছে ৭৬-৮০ বয়সি রোগীদের। আর আক্রান্তের হারে শীর্ষে রয়েছে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সিরা। এ বয়সিদের মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৬৯৩ জন, যার হার ১৪ শতাংশ। এর পরেই ৯ হাজার ৪৭৩ রয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিরা ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে সবচেয়ে ৩১ থেকে ৩৬ বছর বয়সিদের আক্রান্তের হার সবচেয়ে কম।
অধিদফতরের তথ্য মতে, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে জানুয়ারিতে ১০ জনের মৃত্যু, ফেব্রুয়ারিতে তিনজন, এপ্রিলে সাতজন, মে মাসে তিনজন, জুন মাসে ১৯ জন, জুলাই মাসে ৪১ জন, আগস্ট মাসে ৩৯ জন মারা যান। তবে মার্চ মাসে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। এ ছাড়া এ বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ১ হাজার ১৬১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন, মার্চে ৩৩৬ জন, এপ্রিলে ৭০১ জন, মে মাসে ১ হাজার ৭৭৩ জন, জুন মাসে ৫ হাজার ৯৫১ জন, জুলাই মাসে ১০ হাজার ৬৮৪ জন, আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়। আর আক্রান্ত হন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন।
ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৫০৬ জন : শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২১৩ জন, এর পরেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০৮ জন বরিশাল বিভাগে ৫৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১৬ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
২০০০ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। আর ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে শীতের সময়ও এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। দেশের গত কয়েক বছরের তথ্যে দেখা গেছে, জুলাই মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণ চূড়ায় অবস্থান করে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় নভেম্বর-ডিসেম্বর এমনকি জানুয়ারি মাস পর্যন্ত।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা : এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার সময়ের আলোকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও আমরা করতে পারিনি। এটা অবশ্যই আমাদের এক ধরনের ব্যর্থতা। আর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদি মশা নিয়ন্ত্রণে করা না যায় তাহলে রোগীর সংখ্যা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। আর রোগী বাড়লে মৃতের সংখ্যাও বাড়বে। কারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য যে পরিমাণ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তা তুলনায় অপ্রতুল।
ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে এবার বেশি মৃত্যু হচ্ছে উল্লেখ তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে সাধারণত জ্বর থাকা অবস্থায় ডেঙ্গু রোগী মারা যায় না বা জটিলতা শুরু হয় না। বরং বিপদ শুরু হয় আসলে চার দিন পরে জ্বর কমার পর। তবে যারা প্রথমবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হন তাদের শরীরে অন্য কোনো জটিলতা না থাকলে সাধারণত পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যান। কিন্তু যারা দ্বিতীয় বা তার বেশিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তারাই ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে বা হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। আবার কেউ যখতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তখন তার প্লাজমা লিকেজ হয়। সার্কুলেশন থেকে তরল পদার্থ (প্লাজমা) বের হয়ে পেটে জমা হয়, ফুসফুসের চারপাশে জমা হয়। তখন রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, রোগীর বোধশক্তি কমে যায় এবং বমি হতে থাকে। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়। তাই এ সময়ে কারও জ্বর হলে কোনোভাবেই সেটাকে অবহেলা করা যাবে না। অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে ডেঙ্গু রোগ এখন সারা বছরই থাকবে এমন আশঙ্কা জানিয়ে কীটতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সময়ের আলোকে বলেন, একসময় ধারণা করা হতো, বর্ষাকাল মানেই ডেঙ্গুর মৌসুম। কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলে যাওয়ার সময় এসেছে। কারণ এখন শুধু বর্ষা নয়, শীত-গ্রীষ্মেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। যদি আমরা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারি, তাহলে শীতকালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, মূলত এডিসের ভরা মৌসুম হচ্ছে জুন থেকে সেপ্টেম্বর। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের পর্যালোচনায় দেখা গেছে মৌসুমের পরে ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। আর এখন যেহেতু প্রায়ই থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে ফলে এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযুক্ত জায়গা তৈরি হচ্ছে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, লোকবলের ঘাটতিও জনসচেতনতার অভাবে উল্টো শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়েছে। তাই মশক নিধনের কার্যক্রম শুধু মৌসুমকেন্দ্রিক চালালে ফল পাওয়া যাবে না। এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজনন উৎস ধ্বংস করার জন্য বছরব্যাপী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদারের পরামর্শ এ বিশেষজ্ঞের।