Desh Sangbad
Desh Sangbad
শিরোনাম:
প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় লালমাই পাহাড় সংরক্ষণের তাগিদ
Published : Thursday, 29 October, 2026 at 4:02 PM

লালমাই পাহাড় সংরক্ষণ, ছবিঃ সংগৃহীত

লালমাই পাহাড় সংরক্ষণ, ছবিঃ সংগৃহীত

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণি সংরক্ষণে প্রশাসনের  কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে থাকলেও প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কুমিল্লাবাসী ।

প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, সড়ক সম্প্রসারণ, ইট ভাটার মাটি সংগ্রহ এবং নিচু জমি ভরাটের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের মাটি কাটা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার পরও বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ২০১৫ সালে প্রকাশিত ময়নামতি-লালমাই বিষয়ক বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা শহর থেকে ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত লালমাই-ময়নামতি পাহাড় শ্রেণির আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার। পাহাড়টির সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৫৫ মিটার এবং গড় উচ্চতা ২১ মিটার। এর উত্তর প্রান্তে রয়েছে রানী ময়নামতির প্রাসাদ এবং দক্ষিণ প্রান্তে প্রাচীন চণ্ডীমুড়া মন্দির।

সদর দক্ষিণ উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার লালমাই পাহাড় ও টিলা শ্রেণির দুই হাজার ১২১ একর ৫০ শতাংশ জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন। সরকারি এক নম্বর খাস খতিয়ানে রয়েছে ১০৩ একর ২৫ শতাংশ এবং বন বিভাগের পাঁচ নম্বর খতিয়ানে রয়েছে ১৮৩ একর ১২ শতাংশ জমি।

জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে এক হাজার ৮৫৪ একর ৯৩ শতাংশ জমি হুকুমদখল করে কুমিল্লা সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৫৯ সালে ১৫৬ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)। কোটবাড়ীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেক্টর সদর দপ্তর ও সংরক্ষিত এলাকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১০০ একর পাহাড়ি জমি।

১৯৮৩ সালে ৫২ একর জমিতে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সালে ৫০ একর পাহাড়ি জমিতে যাত্রা শুরু করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। পরে ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের জন্য ২০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৩১ একর পাহাড় ও টিলা শ্রেণির জমি রয়েছে। সেখানে কয়েকটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক সালমান চৌধুরী শাওন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বড় ভবন নির্মাণের কাজ তিনি সরেজমিনে দেখেছেন। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে তার মনে হয়েছে, পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শহিদুল হাসান বলেন, পাহাড়ে ভবন নির্মাণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেছে। অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম জানান, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তিনি চলতি বছরের মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ ভবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় নির্মাণ কাজের শুরুতে পাহাড় কাটা হয়েছিল কি না, তা আমার জানা নেই।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি পাহাড়ি জমিতে ২০১৪ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি সিসিএন বিশ্ববিদ্যালয়, সিসিএন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও সিসিএন মডেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছে এবং ভবন নির্মাণে পাহাড়ের ক্ষতি হচ্ছে না।

সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর, সালমানপুর ও জামমুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে রিসোর্ট, বিনোদন কেন্দ্র এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের চিত্র দেখা গেছে।

বড় ধর্মপুর এলাকায় ২০২১ সালে প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের সময় পাহাড়ের এক লাখ ১৪ হাজার ঘনফুটের বেশি মাটি কাটার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর এনফোর্সমেন্ট মামলা করে।

একই এলাকায় ‘প্রবাসী পর্যটন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন’ নির্মাণের জন্য একটি পাহাড় স্টিলের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

এলাকাটির কাছেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে চক্ষু হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ দেখা গেছে। 

অন্যদিকে ময়নামতি জাদুঘরের পশ্চিমের সড়কের দুই পাশে ‘নীলকুঞ্জ’ ও ‘কাশবন’ নামে দুটি রিসোর্ট রয়েছে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড় কেটে নির্মিত রিসোর্ট দুটি প্রায় এক যুগ ধরে চলছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে সালমানপুর এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’ নামে একটি বিনোদন পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৫০ একর পাহাড়ি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ক্ষতিসাধন করে সেখানে রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জামমুড়া এলাকায় টিলা কেটে ‘ডাইনোসর পার্ক’ নির্মাণ করা হয়েছে। একই এলাকায় পাহাড় সমতল করার দৃশ্যও দেখা গেছে। বড় ধর্মপুর চৌধুরী চা প্রকল্পের পাশেও পাহাড় কাটার চিহ্ন রয়েছে।

লালমাই-ময়নামতি পাহাড় প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ অঞ্চলে অন্তত ছয়টি রাজবংশের ৩৪ জন রাজার শাসনামলের বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৫ সাল থেকে এখানে নিয়মিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। এ পর্যন্ত ৫০টির বেশি প্রত্নস্থল শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শালবন বিহার, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া এবং রানী ময়নামতির প্রাসাদ ও মন্দির উল্লেখযোগ্য।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, পাহাড় জুড়ে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিবছর খননে নতুন নিদর্শন উন্মোচিত হচ্ছে। অবাধে পাহাড় কাটা ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক নিদর্শন অনাবিষ্কৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশকে লালমাই পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় পাহাড়ি এলাকায় ঘন গাছপালা, বাঁশঝাড় ও বুনো লতা ছিল। বন্য শূকর, মেছোবাঘ, বুনো বিড়াল, শিয়াল, হনুমান, সজারু, খরগোশ ও বাদুড়সহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী এবং নানা প্রজাতির পাখির বিচরণ ছিল। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, গাছপালা উজাড় ও বসতি সম্প্রসারণের ফলে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

পাহাড় কাটা বন্ধে ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড় ও অন্যান্য পাহাড়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) করা রিটের শুনানি শেষে আদালত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কসহ কয়েকটি পক্ষের বিষয়ে এ নির্দেশনা দেন।

সামাজিক বন বিভাগ কুমিল্লার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নূরুন্নাহার বলেন, লালমাই পাহাড়ে বন বিভাগের বেদখলে থাকা জমি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে থাকা তিন একর জমি নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ বি এম মশিউজ্জামান বলেন, অধিকাংশ পাহাড় ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। কোথাও পাহাড় কাটার খবর পেলেই প্রশাসন অভিযান চালায়। তার দাবি, প্রশাসনের অভিযানের কারণে পাহাড় কাটা অনেকটা কমে এসেছে।

দেশসংবাদ/এনএস


আপনার মতামত দিন
ঢাকার বাতাস আজ অস্বাস্থ্যকর
নিজস্ব প্রতিবেদক
Tuesday, 27 October, 2026
আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
https://deshsangbad.com/ad/1699508455_1491666999_th.jpg
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
সম্পাদক
এম. মোশাররফ হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
ঠিকানা
৮০/২ ভিআইপি রোড, কাকরাইল
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
Developed & Maintenance by i2soft
যোগাযোগ
ফোন: +৮৮ ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবাইল: +৮৮ ০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল: info@deshsangbad.com
up