যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে পাল্টা অবস্থান অব্যাহত রেখেছে তেহরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির যৌথ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে রাতের হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে। আইআরজিসির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
তবে জর্ডান জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই তারা প্রতিহত করেছে। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তারা কঠিন জবাব পাবে।’ একই সঙ্গে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একটি ড্রোন দখলকৃত দক্ষিণ লেবাননে একটি ইসরায়েলি সামরিক যান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবস্থানে যৌথ হামলা চালিয়েছে, যাতে অন্তত ২০ যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, প্রণালির ব্যবস্থাপনায় ইরান ও ওমানের মধ্যে ৫০-৫০ ভাগ নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব তেহরান গ্রহণ করবে না।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ কিংবা প্রস্তাবিত তৃতীয় কোনো রুটও ইরান মেনে নেবে না। পাশাপাশি কৌশলগত এই জলপথে অন্য কোনো দেশের মাইন অপসারণ অভিযান চালানোর বিরোধিতা করেছে তেহরান।
গারিবাবাদি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবিত রুট গ্রহণ করা না হলে অন্য কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রণালি বন্ধ থাকবে এবং আমরা যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি কোনো যুদ্ধজাহাজ, সরঞ্জাম বা জাহাজ মাইন অপসারণের চেষ্টা করলে তা ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরানের কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে আগ্রাসন চালাচ্ছে। পাশাপাশি জুনে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র রক্ষা করেনি বলেও অভিযোগ করেছে তেহরান।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (ইসিএফআর) মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমায়েহ আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। এ কারণেই হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা কোনো ছাড় দিতে চাইছে না।
তিনি বলেন, ইরান মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের বোমা হামলা শুরু করতে পারে এবং সেই পরিস্থিতিতে পরবর্তী সংঘাত আরও ভয়াবহ হবে, যা শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের হামলায় একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়ার সামরিক পণ্যবাহী একটি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইরান বলেছে, এটি ছিল লৌহবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে হামলাটি অনিচ্ছাকৃত ছিল। তবে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাসকে বলেছেন, কিয়েভকে এ ঘটনার দায় নিতে হবে।
বিশ্লেষক গেরানমায়েহ বলেন, ইউক্রেনের হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে তা নিয়ে তেহরানে আলোচনা চলছে। তবে ইরান এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না, যাতে ব্রিটেন বা জার্মানির মতো ইউরোপীয় দেশগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।