| শিরোনাম: |
শাকিব খান
১৯৯৯ সালের ২৮ মে মুক্তি পেয়েছিল শাকিবের প্রথম সিনেমা ‘অনন্ত ভালোবাসা’। আর ঠিক ২৭ বছর পর, ২০২৬ সালের ২৮ মে মুক্তি পেয়েছে তাঁর ২৫৫তম সিনেমা ‘রকস্টার’। এবারের ঈদুল আজহা তাই শুধু আরেকটি উৎসব নয়, এটি যেন জনপ্রিয় এ নায়কের ক্যারিয়ারেরও এক বিশেষ মাইলফলক। ঈদের আগের দিন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাকিবকে ঘিরে শুভেচ্ছা, স্মৃতিচারণা আর আবেগের ঢেউ। কেউ লিখছেন, ‘যার নামে এখনো দর্শক হলমুখী হয়।’ কেউ বলছেন, ‘ঢালিউডের শেষ সুপারস্টার।’ আবার কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘২৭ বছরেও তিনি এখনো নাম্বার ওয়ান।’
‘প্রিয়তমা’, ‘তুফান’, ‘বরবাদ’ ও ‘তাণ্ডব’-এর পর নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যেও শাকিবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উন্মাদনা। যাঁরা একসময় ওটিটি কিংবা বিদেশি কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের অনেকেও আবার ঈদের সিনেমা দেখতে ফিরেছেন প্রেক্ষাগৃহে। ফলে শাকিব খান এখন শুধু নস্টালজিয়ার নাম নন; তিনি একই সঙ্গে পুরোনো ও নতুন—দুই প্রজন্মের কাছেই গ্রহণযোগ্য তারকা। এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রকস্টার’ দেশের সর্বোচ্চসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ পেয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স চেইন ও একক হল মিলিয়ে ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহে চলছে সিনেমাটি। ঈদের দিন স্টার সিনেপ্লেক্সে ছবিটি পেয়েছিল ১৮টি শো। কিন্তু দর্শক-চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে এক দিনের ব্যবধানেই শোর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬-এ।
শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। সোহানুর রহমান সোহানের ‘অনন্ত ভালোবাসা’-র সেই হ্যাংলা-পাতলা তরুণকে দেখে কেউ ভাবেননি, একদিন তিনিই ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকা হবেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে শাকিবকে নিয়ে উপহাস হয়েছে, অভিনয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সালমান শাহর মতো প্রথম সিনেমা দিয়েই বিস্ফোরণ ঘটেনি তাঁর; বরং বছরের পর বছর তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে, লেগে থাকতে হয়েছে। মুনমুন, সাহারা, পরে শাবনূর, পপি, পূর্ণিমাদের বিপরীতে অভিনয় করতে করতে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে তাঁর অবস্থান।
নায়ক মান্নার মৃত্যুর পরই নাকি খুলে যায় শাকিব খানের ভাগ্য—এমন কথা চলচ্চিত্রপাড়ায় প্রচলিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই ভাগ্য তাঁকে তৈরি করে নিতে হয়েছে নিজের পরিশ্রমে। সুযোগের দরজা হয়তো খুলেছিল, কিন্তু সেই দরজার ওপারে টিকে থাকতে হয়েছে তাঁকেই। ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় পর্যন্ত শাকিবকে কেবল বাণিজ্যিক ছবির নায়ক হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু চাষী নজরুল ইসলামের ‘সুভা’ বদলে দেয় সেই ধারণা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পভিত্তিক সেই সিনেমায় তাঁর অভিনয় দেখে অনেক সমালোচকই প্রথমবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। এরপর ‘দেবদাস’ তাঁকে এনে দেয় অভিনয়শিল্পীর স্বীকৃতি। আর ‘কোটি টাকার কাবিন’ তাঁকে দেয় আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা।
একটা সময় সত্যিই মনে হয়েছিল, শাকিব খানের সময় বুঝি শেষের পথে। ব্যক্তিগত জীবন, বিয়ে-ডিভোর্স, অপু বিশ্বাস ও বুবলীকে ঘিরে বিতর্ক, মামলা, বর্জন, এফডিসির রাজনীতি—সব মিলিয়ে তিনি যেন ঘিরে পড়েছিলেন নেতিবাচক আলোচনায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ছিল তুঙ্গে। চলচ্চিত্রপাড়াতেও তখন অনেকে বলতেন, ‘শাকিবের ম্যাজিক শেষ।’ কিন্তু মুক্তির পর দর্শক আবারও তাঁকে গ্রহণ করেছেন। ‘রকস্টার’-এ তিনি হাজির হয়েছেন এক সংগীতশিল্পীর ভূমিকায়। গানের দৃশ্য, পারফরম্যান্স ও আবেগঘন অভিনয়ে নতুন এক শাকিবকে আবিষ্কার করেছেন অনেক দর্শক।
২০২৫ সালের মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের আসরে চলচ্চিত্রে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে দেওয়া হয় বিশেষ সম্মাননা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই চলচ্চিত্র আমাকে অনেক রং দেখিয়েছে। কখনো খুব উচ্ছ্বসিত হয়েছি, কখনো অবাক হয়েছি, কখনো খুব দুঃখিত হয়েছি। আবার অনেক সময় কষ্টের সাগরেও ভেসেছি।” তিনি জানান, আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পর কাছের মানুষদেরও বদলে যেতে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, “অনেক কাছের মানুষও বলেছে, তোমার দিন শেষ শাকিব, ইউ আর ডেড হর্স।” সেই সময় সত্যিই শাকিব ভেবেছিলেন, হয়তো এখানেই ইতি টানতে হবে। কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা তাঁকে থামতে দেয়নি। সেই ‘শেষ চেষ্টা’র নাম ছিল ‘প্রিয়তমা’। ২০২৩ সালে মুক্তির পর সিনেমাটি শুধু ব্যবসাসফল হয়নি, বদলে দেয় তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথও।
‘প্রিয়তমা’-র পর যেন আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ‘রাজকুমার’, ‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’, ‘রকস্টার’—একটার পর একটা সিনেমা তাঁর তারকাখ্যাতিকে আরও বড় করেছে। সমালোচকদের অনেকেও এখন প্রকাশ্যে বলেন, ‘শাকিব খান নাম্বার ওয়ান।’ আর ভক্তদের কাছে তিনি শুধু নায়ক নন, ঢালিউডের ‘রাজকুমার’। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তৈরি করেছেন নিজের আলাদা অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গেও তাঁর জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। সময়ের সঙ্গে নিজেকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক ধাঁচের কাজের সঙ্গে যুক্ত করছেন তিনি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান বাস্তবতায় প্রায় সবাই স্বীকার করেন—প্রযোজকদের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখনো শাকিব খান। বর্তমানে অনেক সিনেমাই মুক্তি পায়, আলোচনাও হয়। দেশ–বিদেশ প্রশংসিত হয়, উৎসবে অংশ নেয়। কিন্তু টিকিট বিক্রি, হলভর্তি দর্শক, ঈদের উন্মাদনা—এসব জায়গায় এখনো সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তার নাম তিনি। এক যুগ আগেও বছরে ১০ থেকে ১২টি সিনেমায় অভিনয় করতেন শাকিব। প্রায় প্রতিদিনই থাকত শুটিং। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নিজের কাজের ধরন বদলেছেন। এখন আর সংখ্যার দিকে নয়; বরং গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিকল্পনা, নির্মাণের মান ও আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে।
তারকাখ্যাতির সঙ্গে বিতর্ক যেন শাকিবের জীবনেরই অংশ। অপু বিশ্বাস ও বুবলীকে ঘিরে সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিয়ে-ডিভোর্স, সন্তান, মামলা, এফডিসির রাজনীতি, নির্বাচন, বর্জন—বিগত এক দশকে নানা ঘটনায় বারবার শিরোনামে এসেছেন তিনি। একসময় মনে হয়েছিল, পর্দার বাইরের বিতর্কই বুঝি ঢেকে দিচ্ছে তাঁর অভিনয়জীবনের সাফল্যকে।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিবারই ঘটেছে উল্টোটা। ব্যক্তিজীবনের ঝড়ের পর তিনি যখন পর্দায় ফিরেছেন, দর্শক যেন আরও বেশি আগ্রহ নিয়ে তাঁকে গ্রহণ করেছে। বরং ‘প্রিয়তমা’, ‘রাজকুমার’, ‘তুফান’, ‘তাণ্ডব’, ‘রকস্টার’ প্রমাণ করেছে, বিতর্ক তাঁর জনপ্রিয়তাকে কমাতে পারেনি; বরং তাঁকে ঘিরে কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শাকিব খান হয়তো নিখুঁত নন। তাঁর ভুলও আছে, বিতর্কও আছে।
কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই—শাকিব খান গত দুই যুগে ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে ছিলেন। তিনি শুধু একজন নায়ক নন, বরং এক যুগের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফেরানোর গল্প, ঈদের সিনেমার উন্মাদনা, প্রযোজকদের ভরসা, বিতর্কের ঝড় পেরিয়ে আবারও শীর্ষে ওঠার কাহিনি।
১৯৯৯ সালের ‘অনন্ত ভালোবাসা’ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ‘রকস্টার’ পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রায় তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয়তা ধরে রাখা শুধু ভাগ্যের ব্যাপার নয়, বরং নিরলস পরিশ্রম, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলানো এবং দর্শকের চাহিদা বোঝার ক্ষমতার ফল। তাঁর ক্যারিয়ার বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র টিকে থাকার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিনেমা যখন সংকটে পড়েছে, প্রেক্ষাগৃহ যখন দর্শকশূন্য হয়েছে, তখনো শাকিব খানের নাম ঘিরেই তৈরি হয়েছে আলোচনার কেন্দ্র, আবারও ফিরেছে দর্শক, নতুন করে জেগেছে প্রত্যাশা।
এ কারণেই তাঁকে নিয়ে বলা যায়—শাকিব খান নিখুঁত না হলেও তিনি ঢালিউডের শেষ সুপারস্টার, যিনি দুই যুগের বেশি সময় ধরে দর্শকের হৃদয়ে রাজত্ব করছেন।
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এইচএম
|
আপনার মতামত দিন
|