| শিরোনাম: |
ঢালিউডের নীরব কান্না
সিনেমা হলের পতনও অপূরণীয়। আশি–নব্বইয়ের দশকে সচল থাকা প্রায় ১২০০টি একক পর্দার হলের সিংহভাগই ভেঙে গেছে বা শপিং মলে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে মাত্র ৫০–৬০টি হল কোনোমতে টিকে আছে। বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি পিছু হটেছেন। লগ্নিকৃত পুঁজি ফেরত আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই বলে করপোরেট হাউজ ও ঐতিহ্যবাহী প্রযোজকেরা সিনেমা নির্মাণ থেকে সরে গেছেন।
শীর্ষ তারকারা হয়তো কোটি টাকার বিজ্ঞাপন চুক্তি ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সুবাদে বিলাসবহুল জীবনযাত্রা বজায় রেখেছেন, কিন্তু সাধারণ শিল্পীরা কর্মহীন। পার্শ্ব-অভিনেতা, চরিত্রাভিনেতা, কৌতুক অভিনেতা ও খলনায়কেরা চরম সংকটে। তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন।
পর্দার পেছনের কারিগরদের হাহাকার আরও গভীর। মেকআপম্যান, লাইটম্যান, প্রোডাকশন বয়, ট্রলিম্যান, স্ট্যান্টম্যান—সবাই কর্মহীন। দৈনিক মজুরির টেকনিশিয়ানদের ঘরে উনুন জ্বলে না, অনাহার–অর্ধাহারে দিন কাটছে। প্রবীণ তারকারা রয়্যালটি বা পেনশন না থাকায় চিকিৎসা সংকটে ভুগছেন। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর তহবিল বা সহকর্মীদের অনুদানের দিকে তাকিয়ে আছেন।
লোকলজ্জা ও সামাজিক চাপের কারণে তারা নিজেদের অভাব প্রকাশ করতে পারছেন না। অন্য কোনো কাজও করতে পারছেন না। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিন্ডিকেট রাজ চলছে। নির্দিষ্ট কয়েকজন শিল্পী সব কাজ পাচ্ছেন, বাকিরা বঞ্চিত। বিদেশি ডাবিং সিরিয়ালের আগ্রাসন দেশীয় শিল্পীদের কাজের সুযোগ আরও সংকুচিত করছে।
অভিনয় ছেড়ে বিকল্প পেশায় যাচ্ছেন অনেক তরুণ অভিনেতা। কেউ দোকান খুলছেন, কেউ অনলাইন ডেলিভারি ব্যবসায় যাচ্ছেন। এতে শিল্পের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। সরকারি অনুদানও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকে।
প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ রুগ্ন। দর্শক ফিরছে না। মাল্টিপ্লেক্স স্থাপন, টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে আনা, নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। কর্পোরেট স্টুডিও সিস্টেম নেই বলে ইন্ডাস্ট্রি এখনো ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। পাইরেসি ও ডিজিটাল চুরি প্রযোজকদের বিনিয়োগ ধ্বংস করছে।
চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো নিজেদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যস্ত। কোনো কার্যকর রোডম্যাপ নেই। অথচ অবিলম্বে সরকারি–বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিশেষ তহবিল গঠন জরুরি। অন্যথায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় সিনেমা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে। জুনিয়র শিল্পীরা রাজপথে দাঁড়িয়েছেন। এফডিসির ফ্লোর ভাড়া বৃদ্ধি ও অব্যবস্থাপনা স্বল্প বাজেটের সিনেমা বন্ধ করে দিচ্ছে। গল্প ও নির্মাণে আধুনিকায়নের অভাবে দর্শক হলবিমুখ। ইউটিউব–ফেসবুক কনটেন্টে কিছু ক্রিয়েটর আয় করলেও মূলধারার শিল্পীরা খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তারা নিঃসঙ্গ ও কর্মহীন জীবন কাটাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে এফডিসি ও ঢালিউড আজ এক ভয়াবহ সংকটে। একসময়কার প্রাণকেন্দ্র আজ নীরব। শিল্পীরা কর্মহীন, কারিগররা অনাহারে, প্রবীণ তারকারা চিকিৎসাহীন। সংস্কৃতি ও মেধার এই অবক্ষয় যদি থামানো না যায়, তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাস শুধু স্মৃতির পাতায় থেকে যাবে।
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এইচএম
|
আপনার মতামত দিন
|