যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি বলেছেন, দেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত তাদের বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরানের অবস্থানে এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেল।
রোববার রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে জাভানি বলেন, যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতদিন ইরানের পদক্ষেপগুলো প্রতিরক্ষামূলক ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি ভেদে সেগুলো আক্রমণাত্মক রূপ নিতে পারে।
কী ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, তা বিস্তারিত জানাননি জাভানি। তবে শত্রুপক্ষকে ‘কৌশলগত চমক’ দেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন তিনি।
এর আগে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালালে দেশটির মিত্র ও আঞ্চলিক সহযোগীদের অবকাঠামোও সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে। এর মধ্যে জ্বালানি নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।
এদিকে ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও গণমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্বার্থে স্থল হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কতটা বাস্তবসম্মত এবং এর ঝুঁকি কতটা, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানে স্থল অভিযান চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কোনো প্রস্তুতির ইঙ্গিতও নেই।
ইরানের এই আক্রমণাত্মক অবস্থানের পেছনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাম্প্রতিক সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে তিনি আইআরজিসির পুরোনো নেতৃত্বের কয়েকজন সদস্য ও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নিরাপত্তা পদে নিয়োগ দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছেন।
আইআরজিসির নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় খামেনি ‘সর্বোচ্চ মাত্রার প্রতিরোধ সক্ষমতা’র পাশাপাশি শত্রুর বিরুদ্ধে ‘শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের’ প্রস্তুতির ওপর জোর দেন।
এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার দাবি করেন, যুদ্ধে ইরান পরাজিত হয়েছে এবং দেশটি নৌ অবরোধের ‘ইস্পাতের দেয়াল’-এর মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীকে ‘খুব শিগগির’ যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করা হবে। পরে হোয়াইট হাউস জানায়, ট্রাম্প ওই মন্তব্যটি রসিকতা করে করেছিলেন।
তবে ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি আরও কঠোর অবস্থান নেন। তিনি ইরানের মাটিতে মার্কিন সেনারা স্থল অভিযান চালালে কোনো মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করতে পারলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কারের ঘোষণা দেন। কোনো নারী এমনটি করতে পারলে পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে বলেও জানান তিনি।
হাতামি বলেন, ‘আগ্রাসনকারীদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমাদের হাত খোলা রয়েছে। আমাদের উদ্যোগের মাধ্যমে তা আরও প্রসারিত হবে।’
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাইও দাবি করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে স্থল অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করেছিল। তবে ‘অপরিণত পরিকল্পনার’ কারণে শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে আসে।
রেজাইয়ের দাবি, জুলাইয়ে দুই সপ্তাহের সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড তেহরান বা উত্তর ইরানে হামলা না চালিয়ে ১৫টি প্রদেশের প্রায় ৫০টি শহরে হামলা চালায়। তার ধারণা, এসব বিমান হামলার উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া এবং ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় পৌঁছানোর পথ তৈরি করা।
তার মতে, দক্ষিণ ইরানে রসদ সরবরাহ বন্ধ করতে সেতু, সড়ক, সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, রাডার ও উপকূলীয় স্থাপনা এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
রেজাই বলেন, হরমুজ প্রণালীতে সেনা নামাতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হবে অন্তত এক লাখ সেনার। তাদের জাগরোস পর্বতমালা পেরিয়ে ফার্স প্রদেশ অতিক্রম করতে হবে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীর আশপাশের ইরানি ভূখণ্ডে প্রতিরক্ষা আরও জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপসহ দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ-রেজা আক্রমিনিয়া বলেন, ইরানের ভূখণ্ডে কোনো বিদেশি সেনাকে অবতরণ করতে না দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। কোনো মার্কিন সেনা ইরানের কোনো দ্বীপে প্রবেশ করলে সেখানেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
একই সঙ্গে ইরানের পশ্চিমে ইরাক ও তুরস্ক সীমান্ত এবং পূর্বে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য তৎপরতা মোকাবিলায়ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি ইরাকি কুর্দিস্তানে অবস্থানরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও অব্যাহত রেখেছে।
মেয়াদ শেষ হলেও এমওইউ নিয়ে চিন্তিত নয় ইরান
এদিকে আইআরজিসির রাজনৈতিক প্রধান জাভানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলবে না।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এমওইউতে যুদ্ধ বন্ধের জন্য নির্দিষ্ট দুই মাসের সময়সীমার কথা উল্লেখ ছিল না। তাই এর মেয়াদ শেষ হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বা হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে না তেহরান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, চাপ, হুমকি বা সময়সীমার ভিত্তিতে ইরান কখনোই নীতি নির্ধারণ করে না। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য যা প্রয়োজন, তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি জানান, হরমুজ প্রণালীর আংশিক পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে আইনি ও কারিগরি জটিলতা, একাধিক পক্ষের সম্পৃক্ততা এবং প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ করতে চাওয়া ‘অশুভ পক্ষগুলোর’ কারণে এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ‘বিজয়ী’ হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের অবসানে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে এখনো ইরানের নেতৃত্বকে রাজি করাতে পারেননি গালিবাফ।