একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যা ৭টায় (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টা) জাতিসংঘের সদর দপ্তরের মিডিয়া চত্বরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
মাহ্দী আমিন বলেন, সফরের তৃতীয় দিনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের শুরুতেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। জবাবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
মাহ্দী আমিন জানান, যে ঐতিহাসিক মঞ্চে একসময় তার বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের গভীর আবেগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বা গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়। বিশ্ব অর্থনীতির বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এই উত্তরণের সময়সীমা কিছুটা বাড়ানোর বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, বহুপাক্ষিক কূটনীতি, বিশ্বশান্তি রক্ষা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অনন্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন আন্তোনিও গুতেরেস।
মাহ্দী আমিন বলেন, বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সংহতি এবং যৌথভাবে কাজ করার যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা ধারণ করেই এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই ধারাবাহিকতায় আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ভাষণকে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হয়েছে। এক আবেগঘন মুহূর্তে তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে এর আগে তার বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেওয়াকে একটি গৌরবময় ঘটনা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভাষণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে মাহ্দী আমিন বলেন, এই ভাষণের মাধ্যমে একজন সরকারপ্রধান কীভাবে প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন, তারই বহিঃপ্রকাশ বিশ্ববাসী দেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শুধু বাংলাদেশের সীমানায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার রক্ষা এবং জাতিসংঘ কীভাবে বিশ্বজুড়ে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঐক্য ফিরিয়ে আনতে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
মাহ্দী আমিন জানান, দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নীতি ও পরিকল্পনাও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হয়েছে। নারী, শিশু ও তরুণদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও পরিবেশের মতো জীবনের মৌলিক প্রতিটি খাতের পরিবর্তন ও অগ্রগতির পরিকল্পনাও তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, আগামীর একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার মূল পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। অডিয়েন্স অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এই বক্তব্য গ্রহণ করেছে বলেও তিনি জানান।
সফরসূচির তৃতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, দিনের অনুষ্ঠানমালাকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল—দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক ও উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচি।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে। এসব বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ককে বহুমাত্রিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং ‘পিপল টু পিপল টাইস’ বা জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সফরসূচিতে দুটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন ছিল বলেও জানান মাহ্দী আমিন। এসব সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা অংশ নেন। এর একটি ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি তথা পরিবেশবিষয়ক এবং অন্যটি মিডওয়াইফারি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক। দ্বিতীয় সম্মেলনটি বাংলাদেশ সরকার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করেছে।
জাতিসংঘে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক দুটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব সম্মেলনে পরিবেশ রক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলো বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কাছে সমাদৃত হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
পরিবেশবিষয়ক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, সেখানে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিবেশনীতি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল খনন, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিস্তারিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন তিনি। পাশাপাশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে বিশ্বমঞ্চে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, যা সম্মেলনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, মিডওয়াইফারি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্মেলনে মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। মাহ্দী আমিন বলেন, প্রসূতি ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং মায়েদের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে ঐতিহ্য তৈরি হয়েছিল, সরকার সেই ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ হাজারই হবেন নারী। পাশাপাশি শুধু মিডওয়াইফারি বা ধাত্রীসেবার জন্য ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এর মাধ্যমে একেবারে প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি পরিবারের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে যে পথচলা শুরু হয়েছিল এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যা নতুন মাত্রা পেয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে নারী ও মায়েদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত এই স্বাস্থ্যনীতি ও উদ্যোগগুলো উপস্থিত বিশ্বনেতা ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্য এবং জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা।