| শিরোনাম: |
|
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে ফিজির সেরুয়া দ্বীপ, ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয়দের ভাষায়, এখানকার সূর্যাস্তের দৃশ্যের মূল্য ‘১০ কোটি ডলার’। মূল ভূখণ্ড থেকে তাকালে দ্বীপটিকে যেন স্বর্গের মতো মনে হয়। খাড়া ঢাল ও নারকেলগাছে ঢাকা দুটি ছোট পাহাড়ের মাঝখানে রয়েছে নিচু সমতল এলাকা। চারপাশে প্রবালপ্রাচীর ও সমৃদ্ধ মাছের বিচরণক্ষেত্র।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। কিন্তু দ্বীপের ভেতরে গেলেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢেউয়ের আঘাত থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য সেখানে কংক্রিটের একটি সমুদ্র প্রতিরক্ষা দেয়ালই একমাত্র ভরসা। অথচ ঢেউ ইতোমধ্যেই সেই দেয়াল পেরিয়ে ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ছে।
দ্বীপটির বাসিন্দা আভেনাই রানুকু এএফপিকে বলেন, ‘বায়ুচাপ যত বেশি থাকে, ঢেউ তত উঁচু হয়। ফলে ঢেউ গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়ে।’ ফিজিতে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে দ্বীপটির বহু বাড়িঘর, সবজির ক্ষেত ও কবরস্থান ঝুঁকির মুখে পড়ে। দ্বীপের পূর্ব প্রান্তে একসময় যেখানে বাড়িঘর ও একটি হাসপাতাল ছিল, সেখানে এখন কংক্রিটের খুঁটির গোড়ায় পানি এসে লাগছে। এত ঝুঁকি সত্ত্বেও অধিকাংশ বাসিন্দা তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার বদলে দ্বীপটির সুরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে চান।
রানুকুর মনে আছে, ছোটবেলায় পাঁচ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ‘উইনস্টন’ আঘাত হানার সময় দ্বীপের বাসিন্দারা আশ্রয় নিতে পাহাড়ের উঁচু অংশে উঠে গিয়েছিলেন।
সেই রাতের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘ভয়ংকর ছিল সেই রাত।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামের প্রধান যখনই এ বিষয়ে বলেন, আমরা সবাই উঁচু জায়গায় চলে যাই। কাউকে পেছনে ফেলে যাওয়া হয় না। সবাই মিলে ঘরের জিনিসপত্র ও খাবার নিয়ে যাই। এটাই আমাদের আশ্রয় নেওয়ার পরিকল্পনা।’
পাহাড়ের নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়ে রানুকু শুনতে পেয়েছিলেন চারদিকে ঢেউয়ের আঘাত ও ঘরের ছাদ ভেসে যাওয়ার শব্দ। সেই পাহাড়েই দাঁড়িয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি থাকা সত্ত্বেও কেন দ্বীপের মানুষ সেখানে বসবাস করতে চান।
রানুকু বলেন, ‘আমরা এই দ্বীপকে ভালোবাসি। এখানে নির্মল বাতাস ও প্রতিদিন মাছ ধরতে সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগ— এসব কারণেই মানুষ এখান থেকে চলে যেতে চায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে আগে বলতেন, পাহাড়ের ওপরের ওই বাড়িতে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখতে হবে। এখানকার দৃশ্যের মূল্য ১০ কোটি ডলার।’
দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তাব অধিকাংশ বাসিন্দা প্রত্যাখ্যান করায় ২০২৫ সালে সেরুয়া গ্রামের মানুষ ‘হ্যাবিট্যাট ফর হিউম্যানিটি’ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে মিলে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করেন।
তাদের লক্ষ্য ছিল, পূর্বপুরুষের বসতভিটা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দ্বীপটির প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িঘর আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করার মতো শক্তিশালী বাড়ি রয়েছে মাত্র তিনটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘উচ্চ জোয়ার ও অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি প্রতিরক্ষা দেয়াল উপচে দ্বীপে প্রবেশের ঘটনা বাড়ছে। মাটিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় মাটির উর্বরতা কমছে। বৃষ্টির পর পানি জমে থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দ্বীপটিতে ঢেউয়ের শক্তি কমিয়ে দেওয়ার মতো প্রাকৃতিক বাধার অভাব রয়েছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে দ্বীপটি প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে রয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ‘দ্বীপের ৫০ শতাংশেরও বেশি বাড়ির ভিত্তি ও ছাদ অস্থিতিশীল। বাড়ির জোড়, দেয়াল ও কাঠামোগত অবলম্বনও দুর্বল। ফলে ঘূর্ণিঝড় ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় এসব বাড়ি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’
প্রতিবেদন পাওয়ার পর দ্বীপটির বাসিন্দারা দ্রুত নিজেদের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে নেমে পড়েন। অক্টোবরে এএফপির সাংবাদিকেরা দ্বীপটি পরিদর্শনের সময় উত্তর উপকূলের পাশে কয়েক ডজন শ্রমিককে বাড়িঘর সংস্কার করতে দেখা যায়।
দুর্বল দেয়াল ও ঢেউটিনের ছাদ খুলে নৌকায় করে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বন্যার ঝুঁকি কমাতে ইতোমধ্যে কিছু বাড়ি উঁচু করা হয়েছে। অন্য বাড়িগুলোও শিগগিরই উঁচু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বীপে যাতায়াত আরও নিরাপদ করতে একটি মজবুত পথ নির্মাণের সুপারিশও করেছে প্রতিবেদনটি। ভাটা থাকলে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে থাকা বিদ্যুতের খুঁটির তার অনুসরণ করে প্রায় ৭৫০ মিটার পথ হেঁটে দ্বীপে যাওয়া সম্ভব।
কিন্তু জোয়ারের সময় নৌকা ছাড়া দ্বীপে যাতায়াতের অন্য কোনো ওপায় থাকে না। এ ক্ষেত্রেও দ্বীপে নৌকা ভেড়ানোর ব্যবস্থা আরও নিরাপদ ও সহজ করার প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রানুকু জানান, এসব উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করতে তার গ্রামের মানুষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফিজির কোরাল কোস্টের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কেন চলে যেতে চাইব? এখানকার দৃশ্যের মূল্য ১০ কোটি ডলার।’
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ
|
আপনার মতামত দিন
|