Desh Sangbad
Desh Sangbad
শিরোনাম: ■ সুন্দরবনের শতবর্ষের ইতিহাসের সাক্ষী বনরানী, বনকন্যা ■ পিংক বাস সার্ভিস নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে ■ সমাজের সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ■ কাতার পৌঁছেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ■ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে করা রিট খারিজ ■ ৬৯০ বন্দি এখনো পলাতক বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ■ অটো ফাইন সিস্টেমের ফলে মহাসড়কে চাঁদাবাজি কমবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সুন্দরবনের শতবর্ষের ইতিহাসের সাক্ষী বনরানী, বনকন্যা
Published : Tuesday, 18 August, 2026 at 7:00 PM

এমএল বনরানী, ছবি: এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির

এমএল বনরানী, ছবি: এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্যের আধারই নয়, এর বুকজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নানা স্মৃতিচিহ্ন। সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়েরই গুরুত্বপূর্ণ দুই সাক্ষী ছিল বিলাসবহুল জলযান ‘এমএল বনরানী’ ও ‘এমএল বনকন্যা’। ব্রিটিশ আমল থেকে সুন্দরবনের প্রশাসনিক ও নৌ-ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই দুই ঐতিহাসিক লঞ্চ শেষ পর্যন্ত নিলামে বিক্রি হয়ে গেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের আধার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতি, বন ব্যবস্থাপনার ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের প্রাচীন নৌ-সংস্কৃতির নানা অধ্যায়। সেই ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী ছিল ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী দুই জলযান—‘এমএল বনরানী’ ও ‘এমএল বনকন্যা’। কিন্তু দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকার পর ঐতিহাসিক ও প্রত্নমূল্য বিবেচনায় সংরক্ষণের পরিবর্তে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে লঞ্চ দুটিকে। ফলে সুন্দরবনের শতবর্ষের এক গুরুত্বপূর্ণ নৌ-ঐতিহ্যের বাস্তব স্মারক হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সুন্দরবনে কর্মরত ব্রিটিশ আমলের বন কর্মকর্তাদের যাতায়াত ও সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য কলকাতার খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে নির্মিত হয়েছিল বিলাসবহুল এই দুই লঞ্চ। ১৯০২ সালে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘এমএল বনকন্যা’ এবং ১৯০৮ সালে ৫২ হাজার ৯৪৭ টাকা ব্যয়ে ‘এমএল বনরানী’ নির্মাণ করা হয়। অপেক্ষাকৃত বিলাসবহুল ‘বনরানী’র স্টিম ইঞ্জিনের ক্ষমতা ছিল ৩৫৪ অশ্বশক্তি।

শত বছরেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের নদী-খালে চলাচল করা এই দুই জলযানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্মৃতি। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটেনের রানি, প্রিন্স, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় অতিথিরা এসব জলযানে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন বলে বন বিভাগের তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু যাত্রী পরিবহন নয়—দুই লঞ্চের নির্মাণশৈলীও ছিল ব্যতিক্রমী। বার্মিজ সেগুন কাঠের কারুকাজ এবং ঐতিহ্যবাহী নৌ-নির্মাণশৈলীর কারণে এগুলো নিজেরাই হয়ে উঠেছিল সুন্দরবনের একটি ভাসমান ইতিহাস। ১৯৬২ সালে লঞ্চ দুটির স্টিম ইঞ্জিন পরিবর্তন করে ডিজেল ইঞ্জিন স্থাপন করা হয়। পরে ২০০৪ সালে আবার ইঞ্জিন পরিবর্তন করে দাইও ইঞ্জিন বসানো হয়। ১৯৯৩ সালে সুন্দরবন বিভাগ পূর্ব ও পশ্চিম—দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পর ‘বনরানী’ পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগ এবং ‘বনকন্যা’ পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের অধীনে চলে যায়।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে একসময় লঞ্চ দুটির চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ‘বনরানী’ সর্বশেষ ২০১৬ সালে চলাচল করে। এরপর খুলনার চানমারী ও ফরেস্ট ঘাট এলাকায় লঞ্চ দুটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হয়। বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টি ও অবহেলায় ক্ষয়ে যেতে থাকে শতবর্ষের এই জলযান।


ঐতিহাসিক লঞ্চ দুটিকে সচল করার একটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। সুন্দরবন বিভাগ খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে সংস্কার ব্যয়ের প্রাক্কলন চাইলে শিপইয়ার্ড জানায়, প্রতিটি লঞ্চ সংস্কারে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা করে মোট প্রায় ৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ২০১৮ সালে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত সংস্কারের জন্য কার্যকর অর্থ বরাদ্দ বা বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এরপর ধীরে ধীরে সামনে আসে নিলামের সিদ্ধান্ত। আর সেখানেই যেন থেমে যায় শতবর্ষের এই দুই জলযানের জীবন্ত ইতিহাস। মাত্র ৪৭ লাখ টাকায় শেষ হলো শতবর্ষের এক অধ্যায়। চলতি বছরের মার্চে নিলাম টেন্ডারের মাধ্যমে ‘এমএল বনরানী’ বিক্রি হয় ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ টাকায়। আর ‘এমএল বনকন্যা’ বিক্রি হয় ২০ লাখ ২৭ হাজার টাকায়। অর্থাৎ দুটি লঞ্চ মিলিয়ে বন বিভাগের আয় হয়েছে ৪৭ লাখ ২২ হাজার ১০০ টাকা। নিলামগ্রহীতারা অর্থ পরিশোধ করলেও সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী তখনও লঞ্চ দুটি বুঝে নেননি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, লঞ্চ দুটি হয়তো আগের মতো সচল করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তাই বলে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার প্রয়োজন ছিল না। সুন্দরবনের করমজল কিংবা আলীবান্দা পর্যটনকেন্দ্রে লঞ্চ দুটিকে সংরক্ষণ করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনের প্রশাসনিক ইতিহাস, ঔপনিবেশিক সময়ের নৌ-ব্যবস্থা এবং প্রাচীন জলযাত্রার এক অনন্য অধ্যায় তুলে ধরা যেত।

একটি ঐতিহাসিক লঞ্চকে ঘিরে তৈরি হতে পারত ছোট্ট নৌ-জাদুঘর। সেখানে রাখা যেত পুরোনো নকশা, ইঞ্জিনের অংশ, ছবি, যাত্রার স্মৃতি, বন বিভাগের নথি এবং সুন্দরবন ভ্রমণকারী দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইতিহাস। এতে সুন্দরবনের পর্যটনেও যোগ হতে পারত নতুন মাত্রা।

বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, জরাজীর্ণ ও অচল লঞ্চ দুটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নিলাম টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। তবে মূল লঞ্চ সংরক্ষণ সম্ভব না হলেও এগুলোর আদলে রেপ্লিকা তৈরি করা গেলে নতুন প্রজন্ম সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে বলে তিনি মত দিয়েছেন।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদও ‘বনরানী’ ও ‘বনকন্যা’র ঐতিহাসিক মূল্য স্বীকার করে নতুন প্রজন্মের কাছে এ ঐতিহ্য তুলে ধরতে রেপ্লিকা তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছে।

ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় থাকে না; অনেক সময় একটি পুরোনো স্থাপনা, একটি জলযান, একটি সেতু কিংবা একটি কাঠের নকশাও হয়ে ওঠে একটি সময়ের জীবন্ত দলিল। ‘বনরানী’ ও ‘বনকন্যা’ ছিল তেমনই দুটি দলিল।

এগুলোতে ছিল সুন্দরবনের ঔপনিবেশিক প্রশাসনের স্মৃতি, বাংলাদেশের নৌ-ঐতিহ্য, বন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ইতিহাস এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুন্দরবন ভ্রমণের স্মৃতি। তাই নিলামে বিক্রির পর শুধু দুটি পুরোনো লঞ্চের মালিকানা বদলায়নি—সুন্দরবনের ইতিহাসের দুটি দৃশ্যমান অধ্যায়ও হারানোর পথে এগিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এখনো যদি নিলামগ্রহীতাদের কাছ থেকে লঞ্চ দুটি বুঝে নেওয়ার আগেই যথাযথ কর্তৃপক্ষ ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে, তবে হয়তো ইতিহাসের এই শেষ স্মারক দুটির একটি অংশ রক্ষা করা সম্ভব হবে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, অন্তত নির্ভুল নকশা, ছবি, কাঠামো ও ঐতিহাসিক উপাদান সংরক্ষণ করে মানসম্মত পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতি ও নৌ-ঐতিহ্য জাদুঘর নির্মাণ করা জরুরি। কারণ সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়—এটি প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস ও সভ্যতার বহমান গল্প। আর ‘বনরানী’ ও ‘বনকন্যা’ সেই গল্পের শতবর্ষী দুই নীরব সাক্ষী।

দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ


আপনার মতামত দিন
সুন্দরবনের শতবর্ষের ইতিহাসের সাক্ষী বনরানী, বনকন্যা
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট
Tuesday, 18 August, 2026
দেশের সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত
নিজস্ব প্রতিবেদক
Tuesday, 18 August, 2026
 সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত
নিজস্ব প্রতিবেদক
Monday, 17 August, 2026
৪ বিভাগে ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
Monday, 17 August, 2026
টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
Monday, 17 August, 2026
ইন্দোনেশিয়ায় ফের ভূমিকম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
Monday, 17 August, 2026
আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
https://deshsangbad.com/ad/1699508455_1491666999_th.jpg
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
সম্পাদক
এম. মোশাররফ হোসাইন
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
ঠিকানা
৮০২ ভিআইপি রোড, কাকরাইল
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
Developed & Maintenance by i2soft
যোগাযোগ
ফোন: +৮৮ ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবাইল: +৮৮ ০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল: info@deshsangbad.com
up