| শিরোনাম: |
|
জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন—কপ৩১
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ, কোথাও ভয়াবহ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও দাবানল মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি, পানি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এসব সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কপ সম্মেলনে প্রায় সব দেশের সরকার প্রধান বা তাদের মনোনিত প্রতিনিধিরা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। কপ৩১-এর আয়োজক দেশ তুরস্ক। সম্মেলনে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালস করবেন তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুরাত কুরুম এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনার নেতৃত্বে থাকবেন অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের সম্মেলনে আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, জলবায়ু পদক্ষেপের গতি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, বিদ্যুতায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু-সহনশীল নগর, সবুজ শিল্পায়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাও সম্মেলনের কর্মপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০৩৫ সালকে সামনে রেখে কয়েকটি বৈশ্বিক লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে কপ৩১-এর প্রেসিডেন্সি। এর মধ্যে রয়েছে চূড়ান্ত জ্বালানি চাহিদার বিদ্যুৎনির্ভর অংশ বর্তমানের ২০ শতাংশের কিছু বেশি থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা, বৈশ্বিক বর্জ্য বৃদ্ধির হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং ভবন খাতে জ্বালানি ব্যবহারের তীব্রতা অন্তত ২৫ শতাংশ কমানো। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নীতিগত সংস্কার এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্যের পাশাপাশি বাস্তবায়নের পথ, অর্থের উৎস এবং অগ্রগতি পরিমাপের কার্যকর ব্যবস্থার ওপর।
সম্মেলনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের আলোচনার অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে, জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং জুট বা পাটকে প্লাস্টিকের টেকসই বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা। বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য অভিযোজন, প্রশমন ও সহনশীলতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়।
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্পায়ন ও দীর্ঘদিনের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশটিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি, নদীভাঙন, বন্যা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে কৃষি উৎপাদন, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং দারিদ্র্য মোকাবিলার প্রশ্নও জড়িত।
কপ৩১-এর আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠতে পারে জলবায়ু অর্থায়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, কৃষিতে অভিযোজন, উপকূলীয় সুরক্ষা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের প্রাপ্যতা, শর্ত, সময়মতো অর্থ ছাড় এবং প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে বরাদ্দের সামঞ্জস্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নত দেশগুলোর নেতৃত্বে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ পরিমাণকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক সভায় অধিকতর অর্থায়ন ও দ্রুত সহায়তার প্রয়োজন তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কিন্তু অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিশ্রুত অর্থ এবং বাস্তবে ছাড় হওয়া অর্থের মধ্যে ব্যবধান। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ঘোষিত অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি কত অর্থ নতুনভাবে বরাদ্দ হচ্ছে, কতটা অনুদান, কতটা ঋণ এবং অর্থ কোন দেশ বা জনগোষ্ঠীর কাছে কীভাবে পৌঁছাবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। উপকূলীয় বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্র উন্নয়ন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার আগাম সতর্কীকরণ, লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল ঘরবাড়ি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব ক্ষতি ইতোমধ্যে ঘটেছে বা যেসব ক্ষতি অভিযোজনের মাধ্যমে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, সেগুলোর জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার তহবিল বাস্তবে কতটা সহজলভ্য হবে, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো কত দ্রুত সহায়তা পাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে অর্থ কীভাবে পৌঁছাবে—এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত সমাধান বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্যাশা।
অভিযোজনের অর্থায়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও চলবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, নারী ও শিশুদের বিশেষ ঝুঁকি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্ষুদ্র কৃষক, জেলে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রয়োজনকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। জলবায়ু সহনশীলতা তখনই কার্যকর হবে, যখন নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা যাবে।
কপ৩১-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে সবুজ শিল্পায়ন। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য শক্তি, পুনর্ব্যবহার এবং বৃত্তাকার অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে শিল্প খাতের কার্বন নিঃসরণ ও বর্জ্য কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ রূপান্তরের জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নের সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য পাট ও পাটজাত পণ্যকে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ বাড়ানো এবং টেকসই পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে পাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পাটজাত পণ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, পণ্য বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।
জলবায়ু পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ব্যয় যেন উন্নয়নশীল দেশ ও সাধারণ মানুষের ওপর অসমভাবে চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কমাতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ হ্রাস অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবহন ও শিল্প খাতের আধুনিকায়ন এবং বর্জ্য থেকে মিথেন নিঃসরণ কমানোর মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশমন বা নিঃসরণ হ্রাসের নীতি বাস্তবায়নে দেশগুলোর উন্নয়নের স্তর, আর্থিক সক্ষমতা ও জ্বালানি চাহিদার পার্থক্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা না দিয়ে কেবল নিঃসরণ কমানোর চাপ দিলে তা ন্যায়সংগত রূপান্তরের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ বিষয়ে কপ৩১-এ বিদ্যমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরের জন্য একটি প্রশমন প্যাকেজের পক্ষে কাজ করার পরিকল্পনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ২০৪০ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের প্রশমন কর্মসূচি বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে। তবে নতুন জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি না দেওয়ার ইউরোপীয় অবস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে মতপার্থক্য তৈরি করতে পারে। ফলে আনতালিয়ায় নিঃসরণ হ্রাসের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অর্থায়নের ন্যায্যতা—দুটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
কপ সম্মেলনগুলোতে প্রায়ই উচ্চাভিলাষী ঘোষণা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার সামনে আসে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, পর্যাপ্ত অর্থের অভাব এবং দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধের কারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়। কপ৩১-এর সাফল্য তাই শুধু চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র বা নতুন লক্ষ্যের সংখ্যায় বিচার করা উচিত হবে না।
সম্মেলনের সিদ্ধান্তে বাস্তবায়নের সময়সীমা, দায়িত্ব বণ্টন, অর্থায়নের উৎস, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা কতটা স্পষ্ট হচ্ছে, সেটিই হবে মূল বিবেচ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহায়তা দ্রুত পৌঁছানোর কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করা না গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সুফল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে তাই জলবায়ু ন্যায়বিচার, পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং প্রযুক্তি সহায়তার বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে তুলে ধরা জরুরি। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো, জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নের প্রয়োজন তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কপ৩১। দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন উদ্যোগ এবং পাটের মতো পরিবেশবান্ধব পণ্যের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরা যেতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো উপস্থাপন করাও প্রয়োজন। এতে জলবায়ু সহায়তা সংগ্রহের সম্ভাবনা বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিকে দেশের মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা সহজ হবে।
জলবায়ু সংকট কোনো একটি দেশের একক সমস্যা নয়; এর সমাধানেও প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। কিন্তু সম্মিলিত দায়িত্ব মানে সব দেশের সমান দায় নয়। ঐতিহাসিক নিঃসরণ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্ব ও সহায়তার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
আনতালিয়ায় কপ৩১-এর সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—বিশ্বনেতারা জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা স্বীকার করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি ও কার্যকর পদক্ষেপে কতটা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেন। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সম্মেলনের সাফল্য নির্ধারিত হবে তখনই, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তব সহায়তায় রূপ নেবে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষ তার সুফল পাবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের খসড়া আলোচনাপত্র প্রস্তুত ও চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ন্যায্য রূপান্তর, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে কারিগরি প্রতিবেদন তৈরির বিষয়ও রয়েছে। এ ছাড়া কপ৩১-এ বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নে জলবায়ু ঝুঁকি, অভিযোজন, জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগ তুলে ধরার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন, ন্যায্য রূপান্তর ও সবুজ প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বচ্ছভাবে ছাড় করার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধান এম. এ. হাসান বলেন, কপ৩১-এ বাংলাদেশের অগ্রাধিকার—জলবায়ু সংকট, কৃষি ও নারী, অভিযোজন, অর্থায়ন এবং ন্যায়বিচার। নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
|
আপনার মতামত দিন
|