| শিরোনাম: |
|
আইসিডিডিআর,বি-এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. আলিয়া নাহিদ, ছবি: বাসস
আইসিডিডিআর,বি-এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. আলিয়া নাহিদ ‘এনআইএইচআর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’-এর বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন।
কর্মসূচির আওতায় খুলনার কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামের পানির উৎসের লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। খাবার পানির উৎসের মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, উপকূলীয় বাংলাদেশের লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য যে পানির ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই পানিই এখন ক্রমশ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। খাবার পানির লবণাক্ততা এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গর্ভাবস্থায় নারীরাও বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গবেষণার আরেকটি অংশে কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের বা ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের ঝুঁকি রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। এ হার কয়রায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এই তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা পানি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ইন্টারভেনশন প্যাকেজ তৈরি করেছেন। পানি বিষয়ক কর্মসূচির লক্ষ্য হলো কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধি, পানির উৎসের সুষ্ঠু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো।
এর আওতায় কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার ও টিউবওয়েলের পাশাপাশি খাবার পানির উৎসের জন্য একটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে কমিউনিটি মোবিলাইজেশন ও স্বাস্থ্য শিক্ষার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ডিজিটাল সেবা যুক্ত করা হবে। অ্যালগরিদমভিত্তিক ‘ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’-এর মাধ্যমে স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ও ফলো-আপ কার্যক্রমে সহায়তা করা হবে।
গত প্রায় দুই দশক ধরে উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় খাবার পানির লবণাক্ততা, বিশেষ করে সোডিয়ামের আধিক্যের সঙ্গে রক্তচাপ বৃদ্ধির যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্যে খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক মাত্রা এখনো নির্ধারিত হয়নি। সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান কীভাবে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে। তিনি খাবার পানির স্বাস্থ্যভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণে উপযুক্ত নির্দেশিকা প্রণয়নের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস খাবার পানির পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার কারণ হতে পারে। জলোচ্ছ্বাসের পর পানির উৎস দ্রুত পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি উপকূলীয় পোল্ডার বা বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে তা আরও উঁচু করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের প্রভাব সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ এখনও সীমিত। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণকে যুক্ত করে তথ্য-প্রমাণ তৈরি ও সমাধান পরীক্ষা করার মাধ্যমে আইসিডিডিআর,বি এ ঘাটতি পূরণে কাজ করছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মিসেস ফাহমিদা খানম প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য লবণাক্ততা ইতিমধ্যেই বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ আরও বাড়বে। এ ধরনের গবেষণালব্ধ প্রমাণ দেশের ভেতরে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ অতিথি পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নিয়মিত পরিবীক্ষণ জোরদার এবং পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত তৈরি করতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মিস শেখ মোমেনা মনি বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা যদি উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যায় ভূমিকা রাখে, তাহলে প্রতিরোধের উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্যখাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বহু বছরের গবেষণালব্ধ প্রমাণ রয়েছে। এসব প্রমাণ একত্র করে বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা ও নীতিতে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্যানেল ও উন্মুক্ত আলোচনায় শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গণমাধ্যম এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেমিনার থেকে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধি, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে নিরাপদ পানির কার্যক্রম একীভূত করার আহ্বান জানানো হয়।
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ
|
আপনার মতামত দিন
|