| শিরোনাম: |
|
বাংলাদেশ ব্যাংক, ছবি: সংগৃহীত
ব্যাংকিং খাতে সু-শাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারে ব্যাংকের এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মূল সূচক কাঠামো শীর্ষক নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রবিবার জারি করা এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নির্দেশনা অনুযায়ী, শীর্ষ নির্বাহীর পারফরম্যান্স ১০০ নম্বরে পাঁচটি ক্ষেত্রে পরিমাপ করা হবে। ব্যাংকের স্বচ্ছলতা ও তারল্যে ২৫ শতাংশ, সম্পদের মানে ২৫ শতাংশ, মুনাফায় ১০ শতাংশ, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহক ও বাজার আচরণে ১৫ শতাংশ নম্বর থাকবে।
অর্থাৎ একজন এমডি কত মুনাফা করেছেন, তার চেয়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী করেছেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করেছেন কি না এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর করেছেন- এসব বিষয়ও তার মূল্যায়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
খেলাপি ঋণে ব্যর্থতায় সরাসরি নম্বর কর্তন
ছয়টি সূচককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এগুলো হলো- ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর), মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার ঋণ ঘনত্ব, শ্রেণিকৃত ও অবলোপন করা ঋণ আদায় এবং সিএমএসএমই, কৃষি, সবুজ অর্থায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি।
এসবের কোনো একটিতে নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫০ শতাংশের কম অর্জন হলে ওই সূচকে শূন্য নম্বরের পাশাপাশি সামগ্রিক স্কোর থেকেও নির্দিষ্ট হারে নম্বর কাটা হবে। ফলে খেলাপি ঋণ কমানো কিংবা অবলোপন করা ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার প্রভাব সরাসরি পড়বে এমডি-সিইওর চূড়ান্ত স্কোরে।
নীতিমালায় দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, কোনো এমডি-সিইওর মোট স্কোর ৭৫ দশমিক ৫০ হলেও মোট খেলাপি ঋণের অনুপাতের লক্ষ্যে ৫০ শতাংশের কম অর্জন হলে তার স্কোর থেকে ১ দশমিক ৫৬ নম্বরের বেশি কেটে নেওয়া হবে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ব্যর্থ হলে কর্তনের পরিমাণ আরও বাড়বে।
৬৫-এর নিচে হলেই ‘দুর্বল’
মোট স্কোর ৭৫ বা তার বেশি হলে পারফরম্যান্সকে গড়ের চেয়ে ভালো, ৬৫ থেকে ৭৫-এর নিচে হলে গড় এবং ৬৫-এর নিচে হলে গড় এর নিচে হিসেবে বিবেচনা করা হবে। শেষের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক উন্নতির প্রয়োজন হবে।
বেতন-প্রণোদনাতেও প্রভাব
মুল্যায়নের মূল স্কোর শুধু মূল্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এমডি-সিইওর পারিশ্রমিক, প্রণোদনা ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণেও এটি বিবেচনায় নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ, মেয়াদ বাড়ানো এবং উত্তরসূরি পরিকল্পনাতেও এই স্কোর গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ফলে মেয়াদ শেষে কোনো ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্তে তার সময়কালে খেলাপি ঋণ, ঋণ আদায়, মূলধন, তারল্য, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অর্জিত ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ছয় মাস পরপর হিসাব
পরিচালনা পর্ষদকে এমডি-সিইওর পুরো মেয়াদের জন্য কর্মদক্ষতার প্রধান মূল সূচক নির্ধারণ করতে হবে। তবে সাধারণত ছয় মাস পরপর বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। বর্তমান এমডি-সিইওদের প্রথম মূল্যায়নকাল ধরা হয়েছে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত।
আগের প্রান্তিকের কর্মদক্ষতাকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী সময়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবে পরিচালনা পর্ষদ। অনুমোদিত কর্মদক্ষতার প্রধান সূচক কাঠামো বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে নির্ধারিত লক্ষ্য পরিবর্তন বা সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারবে। প্রতিটি মূল্যায়নকাল শেষে বোর্ডকে কর্মদক্ষতার প্রতিবেদনও জমা দিতে হবে।
মুনাফার চেয়ে সু-শাসনে বেশি গুরুত্ব
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- মুনাফার জন্য বরাদ্দ মাত্র ১০ শতাংশ। বিপরীতে ব্যাংকের স্বচ্ছলতা ও তারল্য এবং সু-শাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ- দুই ক্ষেত্রেই ২৫ শতাংশ করে নম্বর রাখা হয়েছে।
সু-শাসনের অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ, অনিয়ম, জরিমানা, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন, আইসিটি ও সাইবার নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় আসবে।
একই সঙ্গে গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তি, ডিজিটাল লেনদেন, বাংলা কিউআর ও অ্যাপভিত্তিক সেবা, সিএমএসএমই ও কৃষিঋণ, সবুজ অর্থায়ন, গ্রামীণ ঋণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং জালিয়াতি প্রতিরোধও মূল্যায়নের আওতায় রাখা হয়েছে।
ব্যাংক পরিচালনায় বাড়ছে জবাবদিহি
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন আরও পরিমাপযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ, ঋণ আদায়, মূলধন, তারল্য, সুশাসন ও গ্রাহকস্বার্থকে সরাসরি এমডি-সিইওর ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দায়বদ্ধতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, অভিন্ন সূচকের মাধ্যমে শীর্ষ নির্বাহীদের পারফরম্যান্স পরিমাপ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, সু-শাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ
|
আপনার মতামত দিন
|