Desh Sangbad
Desh Sangbad
শিরোনাম:
ভারতীয় পণ্যে ১০০ শতাংশ মার্কিন শুল্কারোপের শঙ্কা
Published : Saturday, 19 September, 2026 at 11:08 PM

ভারতীয় পণ্যে ১০০ শতাংশ মার্কিন শুল্কারোপের শঙ্কা, ছবি: গ্রাফিক্স

ভারতীয় পণ্যে ১০০ শতাংশ মার্কিন শুল্কারোপের শঙ্কা, ছবি: গ্রাফিক্স

ভারত থেকে রপ্তানি করা পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির রপ্তানিকারকেরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের লক্ষে ‘স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’ সই করার পর নতুন করে এ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করা দেশগুলোর ওপর এই আইনের আওতায় উচ্চহারে শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ভারতীয় রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে দেশটির বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। এমনকি শুল্কের হার অনেক বেশি হলে যুক্তরাষ্ট্রে কিছু পণ্যের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনের (এফআইইও) প্রেসিডেন্ট এসসি রালহান বলেন, ‘আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র যদি উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে, তাহলে দেশটিতে আমাদের রপ্তানি পুরোপুরি থেমে যেতে পারে। কোনো আমদানিকারকের পক্ষেই এত বেশি শুল্ক বহন করা সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ভারতের প্রকৌশল খাতের অনেক রপ্তানিকারকের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় ধরনের ব্যবসা রয়েছে। ফলে নতুন কোনো শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওয়াশিংটনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

তবে ভারতীয় রপ্তানিতে নতুন আইনের প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ শুল্কের হার, কোন কোন পণ্যের ওপর তা প্রযোজ্য হবে এবং কখন থেকে তা কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিস্তারিত জানায়নি।

শুল্কের চেয়েও বেশি উদ্বেগ অনিশ্চয়তা নিয়ে

মুম্বাইভিত্তিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান টেকনোক্রাফট ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরদ সারাফ বলেন, শুল্কের চেয়েও বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, নতুন সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে হলে প্রথমে শুল্কের হার ও এর আওতা জানতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ, বিশেষ করে চীনের পণ্যের ওপর কী ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সারাফের ভাষায়, নতুন আইনটি দুই দেশের বিদ্যমান সুস্থ বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভারতসহ কয়েকটি দেশের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও ট্রাম্প প্রশাসন এ পদক্ষেপ নিতে পারে।

১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের আশঙ্কা

১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প ‘স্যানকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’-এ স্বাক্ষর করেন। আইনটি রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি করেছে। ভারত ও চীনও সম্ভাব্যভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে এটি কার্যকর হওয়ার কথা। আইনে বলা হয়েছে, আইন কার্যকরের আগের ১২ মাসে মোট পরিমাণের হিসাবে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে।

ট্রেড প্রমোশন কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার (টিপিসিআই) চেয়ারম্যান মোহিত সিংলা এই উদ্যোগকে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য ‘বড় উদ্বেগের বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, শুল্ক আরোপ করা হলে নির্দিষ্ট কিছু খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের বড় নির্ভরতা

যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এপ্রিল-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ৪২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৮ বিলিয়ন ডলার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১৪০ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এর আগের অর্থবছরে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ছিল ৮৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ৫৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওষুধ ও জৈবপ্রযুক্তিজাত পণ্য, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, মূল্যবান ও আধামূল্যবান পাথর, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর গয়না, তুলার তৈরি পোশাক এবং লোহা-ইস্পাতজাত পণ্য।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত প্রধানত অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, কয়লা ও কোক, কাটা ও পালিশ করা হীরা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বিমান ও মহাকাশযান এবং স্বর্ণ আমদানি করে। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের সফটওয়্যার সেবা রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে।

শুল্ক বিরোধের ধারাবাহিকতা

ভারতীয় পণ্যে মার্কিন শুল্ক নিয়ে বিরোধের নতুন পর্যায় শুরু হয় ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল। সেদিন ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে মোট ২৬ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেন—এর মধ্যে ছিল ১০ শতাংশ বেসলাইন শুল্ক এবং ১৬ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক।

৯ এপ্রিল পারস্পরিক শুল্কের অংশটি ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হলেও ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর আরো শুল্ক আরোপ করা হয়। রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টি কেন্দ্র করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে অধিকাংশ ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কের হার একপর্যায়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ পারস্পরিক শুল্ক ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। তবে সেই হার কার্যকর হয়নি। পরে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বৈশ্বিক ও ভারত-নির্দিষ্ট শুল্কব্যবস্থা চালু করে। সর্বশেষ ১৮ সেপ্টেম্বরের নতুন আইন ভারতীয় পণ্যে সম্ভাব্য ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের আশঙ্কা আরো বাড়িয়েছে।

‘শক্তি নিরাপত্তার বিনিময়ে সাময়িক শুল্ক ছাড় নয়’

ভারতের থিংকট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) মনে করছে, নতুন মার্কিন আইন ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমানোর জন্য চাপ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

জিটিআরআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, ভারতের উচিত সাময়িক শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলা। তার বক্তব্য, কোনো বাণিজ্য চুক্তি সই করা বা রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করলেও ভবিষ্যতে মার্কিন বাণিজ্য আইনের আওতায় নতুন শুল্ক বা অন্যান্য পদক্ষেপের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না। ভারতের চামড়া ও জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ফারিদা গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিক আহমেদও নতুন শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানের মোট রপ্তানির প্রায় ৬৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। ফলে সেখানে শুল্ক আরও বাড়লে তাদের রপ্তানিতে সরাসরি চাপ পড়বে।

রপ্তানিকারকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে উচ্চহারের মার্কিন শুল্ক আরোপ করা হলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। তবে চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কী হারে শুল্ক আরোপ করে, কোন কোন পণ্যকে এর আওতায় আনে এবং ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জন্য কী ধরনের শুল্কহার নির্ধারণ করে—তার ওপর।সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন

দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ


আপনার মতামত দিন
আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর >>
https://deshsangbad.com/ad/1699508455_1491666999_th.jpg
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে আমরা
সম্পাদক
ফাতেমা বেগম
উপদেষ্টা সম্পাদক
ব্রি. জে. (অব.) আবদুস সবুর মিঞা
ঠিকানা
৮০/২ ভিআইপি রোড, কাকরাইল
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
Developed & Maintenance by i2soft
যোগাযোগ
ফোন: +৮৮ ০২ ৪৮৩১১১০১-২
মোবাইল: +৮৮ ০১৭১৩ ৬০১৭২৯
ইমেইল: info@deshsangbad.com
up