| শিরোনাম: |
|
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, ছবি: সংগৃহীত
২০ আগস্ট জাতীয় পরিষদ ডিফেন্স ফোর্সেস অব পাকিস্তান অ্যাক্ট, ২০২৬ এবং ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১০-এর সংশোধনী অনুমোদন করে। বর্তমানে সেনাপ্রধান ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একই সঙ্গে সিডিএফের দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, দেশটির রাজনৈতিক জীবনে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে; তারা চারটি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সরাসরি শাসন করেছে।
কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীই কখনো পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। নতুন আইনটি সেনাপ্রধানের হাতে থাকা একধরনের কর্তৃত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা তিনি প্রায়শই অনানুষ্ঠানিকভাবে ভোগ করতেন।
নতুন আইনে ১৯৭৬ সালে চালু হওয়া চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি (সিজেসিএসসি) পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে গঠিত হয়েছে ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স (ডিএফএইচকিউ)। সিডিএফ এখন সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ওপর সামগ্রিক অপারেশনাল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবেন।
আগের সিজেসিএসসি মূলত তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করত; সরাসরি কমান্ড দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী থেকে সিডিএফ, এরপর তিন বাহিনীর প্রধান এবং মাঠপর্যায়ের কমান্ড—এমন একটি সুস্পষ্ট কমান্ড চেইন তৈরি হয়েছে।
নতুন কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো এটি পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থাকে আরও বেশি সেনাবাহিনীকেন্দ্রিক করে তুলবে কি না। বিশেষ করে পারমাণবিক সক্ষমতা-সম্পন্ন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা কমান্ডার ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড পদটি কেবল সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে নৌ ও বিমান বাহিনীর চার তারকা কর্মকর্তাদের ওই গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে তিন বাহিনীর মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর স্বাতন্ত্র্য ও প্রভাব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নতুন আইন পাকিস্তানের পারমাণবিক কমান্ড কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে। সিডিএফ জাতীয় কমান্ড অথরিটির উপ-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পারমাণবিক অস্ত্রের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় কমান্ড অথরিটির হাতেই থাকার কথা।
বিশ্লেষকদের মতে, স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশন (এসপিডি) আগের মতোই পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে বাস্তবে পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিডিএফের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। নতুন আইন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এতে পাকিস্তানের নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের ওপর সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা আরো বাড়বে কি না।
সমালোচকদের মতে, কর্মকর্তাদের বরখাস্ত, অবসর বা চাকরির মেয়াদ কমানোর মতো কিছু ক্ষমতা এখন সিডিএফের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে।
এ নিয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৪৩ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদে সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড ফেডারেল সরকারের হাতে থাকার কথা বলা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, সিডিএফকে তিন বাহিনীর ওপর সরাসরি অপারেশনাল কমান্ড দেওয়ার ফলে সাংবিধানিক এই নীতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের সমর্থক আইনজীবীদের যুক্তি, গত বছরের সংবিধান সংশোধনীর পর নতুন আইনগুলো সেই সাংবিধানিক কাঠামোরই প্রয়োজনীয় আইনি রূপ দিয়েছে।
তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য হলো—ব্রিটেন বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে শীর্ষ সামরিক কমান্ডার সাধারণত কোনো একটি বাহিনীর একই সঙ্গে প্রধান থাকেন না। পাকিস্তানে সিডিএফ পদটি সেনাপ্রধানের পদটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত, যা সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রকে আরো বেশি সেনাবাহিনীর দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, নতুন আইন পাকিস্তানের সামরিক কমান্ড ব্যবস্থায় গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি। এর ফলে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে কমান্ড আরো কেন্দ্রীভূত হওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ
|
আপনার মতামত দিন
|