| শিরোনাম: |
|
আনিসুজ্জামান রনি, ছবি: সংগৃহীত
প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে ফ্ল্যাটটি যে কোম্পানির নামে রয়েছে তার বাংলাদেশি মালিক আনিসুজ্জামান ‘রনি’ চৌধুরী মাত্র এক পাউন্ডের বিনিময়ে কোম্পানিটি অন্যের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) আবেদনের পর চলতি সপ্তাহে আদালত এ জব্দাদেশ দেন। রিজেন্টস পার্কের কাছে অবস্থিত বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে আনিসুজ্জামান সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবারের শুনানিতে আদালতকে জানানো হয়, বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামানের বিরুদ্ধে গত বছর একটি ‘আনএক্সপ্লেইন্ড ওয়েলথ অর্ডার’ বা সম্পদের অজ্ঞাত উৎসসংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছিল। ওই আদেশে ফ্ল্যাটটি বৈধ অর্থে কেনা হয়েছিল, এমন প্রমাণ দিতে বলা হয়।
যুক্তরাজ্যের দুর্নীতিবিরোধী আইন অনুযায়ী, সম্পদের বৈধ উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সম্পদ অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বলে আইনি ধারণা তৈরি হতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতে দাখিল করা এনসিএর এক তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যে ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিকানা গোপন করতে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বচ্ছ’ একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরে আনিসুজ্জামান ফ্ল্যাটের মালিকানা কোম্পানিটি মাত্র এক পাউন্ডের বিনিময়ে তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে জটিল আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে এনসিএ।
এনসিএ আইনজীবীরা আদালতে লিখিত বক্তব্যে বলেন, এই হস্তান্তর মূলত একটি সুবিধার জন্য করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংকের কাছ থেকে ফ্ল্যাটটির বিপরীতে নেওয়া ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করা।
এনসিএর দাবি, কোম্পানির শেয়ার এক পাউন্ডে হস্তান্তর করা হলেও পুরো শেয়ার বিক্রির মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন পাউন্ড।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, নথিপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং মার্কিন সংগীতশিল্পী ক্রিস ব্রাউনের জাল সই ব্যবহার করা হয়েছিল। তার মতে, এটি প্রতারণার বিষয়ে অভিযুক্তের ‘বেপরোয়া’ মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।
বিচারপতি কারেন স্টেইন রায় দেন, ফ্ল্যাটটি অপরাধলব্ধ সম্পদ হওয়ার পক্ষে যুক্তিসংগতভাবে গ্রহণযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। এরপর তিনি সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন। তবে বাড়ির মালিকের দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত আইনি কার্যক্রম চালানোর সুযোগ রাখতে আদেশে একটি ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে।
আনিসুজ্জামানের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, তারা জব্দের আবেদনের বিরোধিতা করছেন না।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে আনিসুজ্জামান বলেন, আইনজীবীদের পরামর্শে তিনি সম্পদ জব্দের আবেদনের বিরোধিতা করেননি। তবে তিনি কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
তিনি বলেন, এনসিএ দেওয়ানি আইনে সম্পদ পুনরুদ্ধারের মামলা করলে তিনি জোরালোভাবে তা মোকাবিলা করবেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অসত্য, তা প্রমাণ করবেন।
ফ্ল্যাটটির মালিকানা আড়াল করার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন আনিসুজ্জামান। তার দাবি, সম্পত্তিটির তথ্য এনসিএর কাছে ‘স্বচ্ছভাবে’ প্রকাশ করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, তার স্ত্রী ও সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হলে তিনি তারও জোরালো প্রতিবাদ জানাবেন। তার দাবি, এ ঘটনায় স্ত্রী ও সন্তানদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
এনসিএর তদন্ত কর্মকর্তার জুলাই মাসে দেওয়া সাক্ষ্য বিবৃতি অনুযায়ী, আনিসুজ্জামান যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন এবং ফ্ল্যাটটিকে তার মূল আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করতেন।
ভূমি নিবন্ধনের নথি অনুযায়ী, আনিসুজ্জামান তার কোম্পানি 'রনি ৪২ লিমিটেডের' মাধ্যমে ২০২৩ সালে ১২ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ডে রিজেন্টস পার্কের ফ্ল্যাটটি কেনেন। পরে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে ‘পিএনএন ইউকে প্রপার্টিজ’ রাখা হয়।
এনসিএ আরও জানিয়েছে, ডিবিএস ব্যাংকের ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করা হয়নি। ঋণ পরিশোধ না করে খেলাপি হওয়ার পর সিঙ্গাপুরের ব্যাংকটি ফ্ল্যাটটির দখল নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যরা ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন পর্যন্ত ২৯৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশে থাকা এমন সম্পদের সন্ধান শুরু করে, যেগুলো স্বৈরাচারী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থে কেনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের জুনে এনসিএ সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করে। সংস্থাটি তখন বিষয়টিকে চলমান দেওয়ানি তদন্তের অংশ বলে উল্লেখ করে। একই মাসে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সম্পদের অজ্ঞাত উৎস সংক্রান্ত আদেশও পায় এনসিএ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী যুক্তরাজ্যের ব্রিজিং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান মার্কেট ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনসের কাছ থেকে শত শত বন্ধকি ঋণ নিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি এ বছর প্রতারণার অভিযোগে পড়ে। এর আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের কাছে আনিসুজ্জামান দাবি করেছিলেন, ভাই সাইফুজ্জামানের সঙ্গে তার কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ
|
আপনার মতামত দিন
|