দেশের রপ্তানি আয় নেতিবাচক ধারায় থাকলেও চলতি অর্থবছর ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে সরকার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি করে যেখানে আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। আর সেবা খাত মিলিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মোট ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরি, ব্যবসা সহজ করা এবং রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
কিন্তু রপ্তানিকারকরা বলছেন, জ্বালানির ঘাটতিসহ দেশে বিদ্যমান নানা সংকট এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় ভালো নেই রপ্তানি খাত। রপ্তানির গতি ধরে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানি হঠাৎ অনেকখানি বৃদ্ধি পাবে—এমন সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, বাস্তবতার নিরিখে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা দুরূহ হবে।
গত ২৬ জুলাই সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ বিষয়ক সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, চলতি অর্থবছরে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট রপ্তানি আয় ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন এবং সেবা রপ্তানি থেকে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর আগে সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সাড়ে ৬৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। অথচ অর্থবছর শেষে যা অর্জন করা যায়নি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখে গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বেশিরভাগ সময়ই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা ছিল। সদ্য সমাপ্ত এ অর্থবছরে দেশের পণ্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দূরে থাক আগের অর্থবছরের আয়কেও ছুঁতে পারেনি। গত জুন মাসে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেশি রপ্তানির পরও ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয় বিদায়ী অর্থবছর।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। যেখানে পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ বিলিয়ন ডলার কম আয় হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরের জন্য ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যা গত অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের চেয়ে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেশি।
অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানামুখী সংকটে রপ্তানি আয়ের এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, গত অর্থবছর রপ্তানি আয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয়েছে। বর্তমানে শিল্প-কারখানাগুলো জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে। বিনিয়োগেও চাঞ্চল্য নেই। অন্যদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা কাটেনি। রপ্তানির প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদার সংকোচন ঘটেছে। এমন বাস্তবতায় রপ্তানি আয়ে ১৫ শতাংশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’, এটি অর্জন করা দুরূহ হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ, ব্যবসা সহজ করা এবং রপ্তানি গন্তব্যের দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। তিনি জানান, এ বছর বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হবে। আরও অনেকগুলো দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তবে রপ্তানিকারকরা বলছেন, একদিকে দেশে ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার, গ্যাস সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বল দশার কারণে অর্থায়নে সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে নতুন করে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। দেশে এরই মধ্যে গ্যাসের সংকট নতুন করে তীব্র হয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়ছে, বড় বাজারগুলোতে চাহিদা কমেছে। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানি খুব একটা বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন না তারা।
দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। গত অর্থবছরে তৈরি ও নিট পোশাক দুই খাতেই রপ্তানি আয় কমেছে। এ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আগের বছরের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না। বৈশ্বিক চাহিদা, বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবণতা ও প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান—এসেব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে বড় সমস্যা জ্বালানি সংকট। সম্প্রতি এটা তীব্র আকার ধারণ করায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। সরকার রপ্তানি আয়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও জ্বালানি পরিস্থিতি ঠিকঠাক থাকলে আমাদের পক্ষ থেকে ১০ শতাংশের কথা বলেছিলাম। এই ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই কঠিন হবে।
এ লক্ষ্যমাত্রা ‘বাস্তবসম্মত’ নয় বলে মনে করছেন বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, গত এক বছরের মধ্যে প্রায় ১০ মাসই কমেছে। সেখানে এমন কিছু ঘটেনি যে, এক লাফে রপ্তানি ১৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। গ্যাস সংকটে অর্থবছরের শুরুতেই বিশাল উৎপাদন ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বিশ্ববাজারে রপ্তানি আদেশ কম এবং দেশের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; এই পরিস্থিতিতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব; ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়াও অনেক বড় বিষয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। যুক্তরাষ্ট্রেও গত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি ভালো নয়। এই বড় দুই বাজার বাদ দিয়ে বিশ্বের বাকি সব দেশে যদি ১০০ শতাংশ হারেও রপ্তানি বাড়ে, তাহলেও এত বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনযোগ্য নয়।’
লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতানও জানান, চামড়া পণ্যের বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে ক্রয়াদেশ কমছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের তেমন প্রভাব পড়বে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা কমেছে। চামড়ার জুতা ও ব্যাগ আইটেমে ভালো করলেও চামড়া রপ্তানি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।