Published : Wednesday, 14 October, 2026 at 9:27 PM
স্টারলিংক ব্যবহারে কঠোর শাস্তি, সংগৃহীত
ইরানে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারে আরও বিধিনিষেধ আরোপের ইঙ্গিতও দিয়েছে তারা।
ইরানের দাবি, স্টারলিংক শত্রুপক্ষের সামরিক কার্যক্রম, গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্য সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স পরিচালিত স্টারলিংক ইরানের প্রচলিত ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপর আরোপিত কঠোর নজরদারি ও বিধিনিষেধ এড়িয়ে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। তবে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দেশটিতে এই সেবা নিষিদ্ধ করেছে তেহরান। স্টারলিংক ব্যবহার কিংবা এর টার্মিনাল বিতরণের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় সাইবারস্পেস কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ আমিন আগামির স্টারলিংককে শত্রুদের ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, শত্রুপক্ষ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, গুপ্তচরবৃত্তি এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য এই সেবা ব্যবহার করে।
আগামির বলেন, স্টারলিংকের স্যাটেলাইট টার্মিনাল বন্ধ করার জন্য ইরানের হাতে একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কী ধরনের প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম ব্যবহার করে এই সেবা বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। তার দাবি, জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় এ ধরনের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে তেহরানের।
স্টারলিংক ব্যবহারে কঠোর শাস্তি
ইরানে স্টারলিংক ব্যবহার বা নিজের কাছে রাখার জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর ডিভাইস আমদানি ও বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা বা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ যুক্ত হলে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিও রয়েছে।
তেহরানভিত্তিক এক ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আল-জাজিরাকে জানান, স্টারলিংক সংযোগ ব্যাহত করতে ইরানি কর্তৃপক্ষ একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করে। পরিচিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের জ্যামার দিয়ে সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত করা এবং ভুয়া জিপিএস অবস্থান ব্যবহার করে নতুন ডিভাইস চালু করার প্রক্রিয়া ধীর করে দেওয়া। স্থানীয় অ্যাপ ও সেবার সঙ্গে যুক্ত হলে স্টারলিংক-সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট প্রোটোকল শনাক্ত করার চেষ্টাও করা হয়।
এছাড়া টহল, ড্রোনের মাধ্যমে তল্লাশি এবং স্টারলিংক টার্মিনাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত স্থানে অভিযান চালিয়ে ডিভাইস জব্দের চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞের মতে, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তিগতভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং বিকল্প ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও সীমিত করা।
ইন্টারনেট বন্ধের দীর্ঘ ইতিহাস
২০২৬ সালে ইরানের প্রায় ৯ কোটি মানুষ দুবার দীর্ঘ সময়ের জন্য বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় টানা তিন সপ্তাহ ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। আর চলমান যুদ্ধের শুরুতে ৮৮ দিন ধরে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
ইরানের উপপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোহাম্মদ হাফেজ হাকামি সতর্ক করে বলেছেন, স্টারলিংকের ব্যবহার ব্যাপক হয়ে উঠলে দেশটির সাইবারস্পেসের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তার ভাষ্য, প্রচলিত নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল না হওয়ায় স্টারলিংক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কোনও সংকটের সময় ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার মতো পদক্ষেপও নিতে হতে পারে।
২০২২ সাল থেকে ইরানে বিক্ষোভের ভিডিও ও অন্যান্য তথ্য বিদেশে পাঠাতে স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশটিতে চোরাপথে কয়েক হাজার নয়, বরং কয়েক দশ হাজার টার্মিনাল প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হয়। তবে প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি।
কিছু সেবা চালুর সম্ভাবনা
স্টারলিংকের পাশাপাশি ইরানের প্রচলিত ইন্টারনেট ব্যবস্থায়ও ব্যাপক বিধিনিষেধ রয়েছে। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সেবা ও হাজার হাজার ওয়েবসাইট সেখানে বন্ধ। ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে অনেকেই এসব বাধা এড়িয়ে চলেন। তবে এতে সংযোগের গতি কমে যেতে পারে, খরচ বাড়তে পারে এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, সাইবার হামলা থেকে নাগরিক ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কখনও কখনও ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
এদিকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাইবারস্পেসবিষয়ক একটি নীতিমালায় গুগল প্লে ও হোয়াটসঅ্যাপের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে ইউটিউব ও টেলিগ্রাম চালু করতে হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা এবং কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত শর্ত মেনে নিতে হবে। কবে এসব বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হতে পারে, নীতিমালায় সে বিষয়ে কোনও সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়লে ইন্টারনেট ব্যবহারে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের বৈশ্বিক ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা