| শিরোনাম: |
|
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু কূটনীতি বিভাগ, ছবি: সংগৃহীত
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু কূটনীতি বিভাগের মহাপরিচালক কাজি এহসানুল হক জানান, কপ৩১ সামনে রেখে কার্বন নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের কপ শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি আদায়ের সম্মেলন নয়; বরং আগের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব থাকবে। এ কারণে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য কপ৩১ অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে বিদ্যুতায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন, সহনশীল নগর, টেকসই কৃষি, সবুজ শিল্পায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি
বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের কৃষি, অবকাঠামো, খাদ্য নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে দেশটিকে। ফলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ন্যায্যতা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ বলেন, জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজেই একটি বৈশ্বিক উদাহরণ। তবে জলবায়ু মোকাবিলায় ব্যয়ের বড় অংশ জাতীয় বাজেট থেকে বহন করতে হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের দাবি কেবল সহানুভূতির নয়, বরং জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ন্যায্য অর্থায়নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
অর্থায়নেই বড় চ্যালেঞ্জ
কপ৩১-এ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকবে জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা। অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহর মতে, জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান ৩.০-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের মোট ১১৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক অর্থায়ন থেকে পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন ও সহনশীলতা গড়ে তুলতে প্রতিবছর প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। তবে বাস্তবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম অর্থ পাওয়া যাচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, উন্নত দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াও জটিল। ঋণনির্ভর অর্থায়নের প্রবণতাও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কপ৩১-এ অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি, অনুদানভিত্তিক সহায়তা, দ্রুত অর্থ ছাড় এবং ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কার্যকর করার বিষয়ে বাংলাদেশের কঠিন দরকষাকষি করতে হবে।
জোটবদ্ধ কূটনীতিতে জোর
জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কার্যকর করা, অভিযোজন প্রকল্পে অনুদান বাড়ানো, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবিতে যৌথ অবস্থান নিলে বাংলাদেশের দরকষাকষির শক্তি বাড়বে।
অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত অবস্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশের সফল অভিযোজন উদ্যোগ ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরতে হবে।
জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু অর্থ নয়, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিও
কপ৩১কে শুধু জলবায়ু সম্মেলন হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এটি অর্থনৈতিক কূটনীতি, প্রযুক্তি সহযোগিতা ও সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণেরও বড় প্ল্যাটফর্ম।
বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উপকূলীয় অবকাঠামো, নগর জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহায়তা চাইতে পারে।
এ ক্ষেত্রে গ্রিন বন্ড, কার্বন ক্রেডিট ও ফলাফলভিত্তিক অর্থায়নের মতো বিকল্প ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, শুধু ঋণনির্ভর অর্থায়নের ওপর নির্ভর করলে বাংলাদেশের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
বাস্তবায়ন সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ
জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা, অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নীতি অনুসরণ এবং প্রকল্পের ফলাফল পরিমাপের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক দাতারা এখন অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্পের বাস্তব ফলাফলের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অভিযোজন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহনশীলতা তৈরির অভিজ্ঞতার কারণে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে জলবায়ু আলোচনায় শক্তিশালী ভূমিকা রেখে আসছে। অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায়ভিত্তিক রূপান্তর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটিকে বৈশ্বিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এদিকে জলবায়ু কূটনীতিকে আরও কার্যকর করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন একটি উইং চালু করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে কপ৩১ বাংলাদেশের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা নয়, বরং ন্যায্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহযোগিতা ও সবুজ বিনিয়োগ নিশ্চিত করার বড় কূটনৈতিক সুযোগ। সম্মেলনে বাংলাদেশ কতটা সফলভাবে নিজের দাবি তুলে ধরতে পারবে, তার ওপর আগামী দিনগুলোতে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন পাওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করবে।
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ
|
আপনার মতামত দিন
|