| শিরোনাম: |
|
ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে দাবানল, ছবি: সংগৃহীত
ইন্দোনেশিয়ার মধ্য কালিমান্তান প্রদেশের এই শহরের উপকণ্ঠে বসতবাড়ির দিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। কয়েক দিন আগে তিন বন্ধুর সঙ্গে আগুন নেভাতে গিয়েছিলেন পেশায় নির্মাণশ্রমিক ও কৃষক সুদারসোনো। কিন্তু আগুনের ধোঁয়ায় নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।
গত সপ্তাহে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় এএফপিকে সুদারসোনো বলেন, ‘আমি মাস্ক পরেছিলাম, চোখে সুরক্ষাচশমাও ছিল। আমি সব ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থাই নিয়েছিলাম। তারপরও চারদিক থেকে ধোঁয়া ঘিরে ধরেছিল। আর সহ্য করতে না পেরে বাড়ি ফিরে আসি।’
দাবানলে তার বাড়ির পেছনের উঠান পুড়ে কালো হয়ে গেছে। সেখানে পড়ে আছে কয়েকটি পোড়া গাছের গুঁড়ি। চারদিকে জমে আছে তীব্র ধোঁয়ার গন্ধ।
অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সুদারসোনো বলেন, ‘আমি আশা করি, আর ধোঁয়াশা থাকবে না। মধ্য কালিমান্তান আগুনমুক্ত হবে, যাতে মানুষ নিরাপদ বোধ করতে পারে, কাজ করতে ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।’
শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত তিন লাখের বেশি মানুষ
মাসের পর মাস ধরে চলা দাবানল ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পালাংকারায়া শহরেই এ সংকটের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত ১১ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির সাতটি প্রদেশে ৩ লাখের বেশি মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন।
পালাংকারায়ার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন আলেক্সান্দ্রা সুরিয়া হাবসারি। তাকে নেবুলাইজার ও অক্সিজেন দেওয়া হয়। নেবুলাইজারের মাধ্যমে ওষুধকে সূক্ষ্ম কণায় পরিণত করে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে পৌঁছাতে সহায়তা করা হয়।
আলেক্সান্দ্রা এএফপিকে বলেন, ‘আমি সত্যিই অতিষ্ঠ। কিন্তু কার ওপর রাগ করব, সেটাও বুঝতে পারছি না। একজন মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব— এ পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’
দাবানলের ধোঁয়ায় ফরমালডিহাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড ও অ্যামোনিয়ার মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকতে পারে। এ ছাড়া এতে রয়েছে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, যা পিএম২.৫ নামে পরিচিত। এসব কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে, এমনকি রক্তপ্রবাহেও পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, পিএম২.৫-এর সংস্পর্শে এলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে ও মৃত্যুঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিষের মতো বাতাসে শ্বাস নিচ্ছেন মানুষ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ইন্দোনেশিয়া কয়েক মাস ধরে দাবানল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশটিতে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি বন ও ভূমি দাবানলে পুড়ে গেছে।
তবে ইন্দোনেশিয়ার সরকার এ হিসাবের সত্যতা নিশ্চিতও করেনি, আবার তা নাকচও করেনি। বিষাক্ত ধোঁয়ায় দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হওয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর পক্ষ থেকে কূটনৈতিক পর্যায়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত সরকারবিরোধী বিক্ষোভে।
ধোঁয়াশার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষের চিকিৎসায় দেশজুড়ে প্রায় ৫০০টি কেন্দ্র স্থাপন করেছে ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এসব কেন্দ্রে বিনা মূল্যে অক্সিজেন ও ধোঁয়াজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি কেন্দ্র রয়েছে মধ্য কালিমান্তান প্রদেশে। দাবানল ও ধোঁয়াশার প্রকোপ এ অঞ্চলে বিশেষভাবে তীব্র। এ ছাড়া পালাংকারায়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ বাস মোতায়েন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এসব বাসের মাধ্যমে মানুষকে বিনা মূল্যে শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এই সেবা পাওয়া ব্যক্তিদের একজন সিতি জুমিয়াতি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চোখ লাল হয়ে জ্বালাপোড়া করা, গলাব্যথা ও কাশির সমস্যায় ভুগছেন।
এএফপিকে সিতি বলেন, ‘আজ এই বাসে আমি বিনা মূল্যে শ্বাস নিতে সহায়তা পাচ্ছি।’স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রিদুয়ান বলেন, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৭ বছর থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষ। জীবিকার প্রয়োজনে বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন বাতাসের মধ্যেও তাঁদের কাজের জন্য বাইরে বের হতে হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার অনেক মানুষের মতো রিদুয়ানেরও একটিই নাম। ৪৩ বছর বয়সী আলেক্সান্দ্রা বলেন, প্রতিদিন অফিসে যাতায়াতের ২০ মিনিটের পথটুকুও এখন তার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের তো নীল আকাশ দেখার, নির্মল অক্সিজেন নেওয়ার, সূর্যের আলো উপভোগ করার এবং বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেওয়ার কথা। কিন্তু পরিস্থিতি যখন এমন, তখন আমরা যা শ্বাসের সঙ্গে নিচ্ছি, তা বিষ।’
দেশসংবাদ/এমএমএইচ/এফএইচ
|
আপনার মতামত দিন
|