মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, ছবিঃ সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, তিনি এ বছরের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
প্রথম মেয়াদে পরমাণু শক্তিধর দেশটির নেতার সঙ্গে গড়ে তোলা সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, কিমের সঙ্গে ‘ভালো সম্পর্ক রাখা’ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে এখন ৫৭টি ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তবে, কিমকে নিয়ে ট্রাম্পের হঠাৎ আগ্রহ এবং যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এশিয়ার মিত্রদের উদ্বিগ্ন করেছে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধ থমকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করছেন কি না, তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে নতুন হেলিপ্যাড পরিদর্শনের সময় ট্রাম্পকে ২০২৬ সালের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি করব।’
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর মধ্যেও উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি দেন ট্রাম্প। ইরানের হাতে পারমাণবিক বোমা ঠেকানোর কারণেই তিনি এ যুদ্ধ চালাচ্ছেন বলে দাবি করে আসছেন।
কিমের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘তার কাছে ৫৭টি অত্যন্ত শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। কখনোই এমনটা হতে দেওয়া উচিত ছিল না। আমি প্রেসিডেন্ট হলে তা হতে দিতাম না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু তার কাছে এগুলো আছে। তার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। আমি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে দিতে পারি না। আর আমি কিম জং উনকে খুব ভালোভাবে চিনি এবং সে ভালোই থাকবে।’
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, নভেম্বরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের শেনঝেনে যাওয়ার সময় তিনি কিমের সঙ্গে বৈঠকের কথা ভাবছেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক বলেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে আনুমানিক ৮০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
আন গিউ-ব্যাক আইনপ্রণেতাদের বলেন, ‘আমরা সাধারণত এর সংখ্যা প্রায় ৮০ থেকে ১২০টি বলে ধারণা করি।’ তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করে যাচ্ছে সিউল।
ওয়াশিংটন উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্য থেকে ‘সরে গেছে’ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আন বলেন, তিনি তা মনে করেন না।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দেশের নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।
বুধবার রাতে তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সমর্থন ও এতে অবদান রাখতে তিনি ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন’।
উত্তর কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত নিয়ে প্রকাশ্যে এত নির্দিষ্ট মূল্যায়ন করাও অস্বাভাবিক।
তবে উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫৭টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ট্রাম্প যে সংখ্যা উল্লেখ করেছেন, তা মার্কিন সরকারের আগের মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, পিয়ংইয়ংয়ের হাতে ৫০ থেকে ৬০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প কিমকে ‘রকেট ম্যান’ বলে উপহাস করেছিলেন এবং উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ‘আগুন ও ক্ষোভ’ ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। পরে তিনি কিমের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেন। ২০১৯ সালে তাদের সর্বশেষ বৈঠক হয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘সুন্দর সুন্দর চিঠি’ আদান-প্রদানের পর তাদের মধ্যে ‘প্রেম হয়ে গিয়েছিল’। তবে ব্যাপক প্রচার পাওয়া ওই বৈঠকগুলোতে পারমাণবিক ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। দ্বিতীয় মেয়াদে এখনো তাদের মধ্যে বৈঠক হয়নি।
তবে গত রোববার হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রুতাপূর্ণ’ সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ দেওয়ার পর ট্রাম্প আবার উত্তর কোরিয়া ইস্যুটিকে গুরুত্বের তালিকায় এনেছেন। কিমের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেই তিনি এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন।
বুধবার ট্রাম্প বলেন, সামরিক মহড়াগুলো কিমের জন্য ‘অত্যন্ত অপমানজনক’ ছিল। প্রায় ৮০ বছর ধরে উত্তর কোরিয়া শাসন করে আসা স্বৈরতান্ত্রিক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের নেতা কিম ‘খুব ভালো আচরণ করেছেন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
-‘সম্পূর্ণ অজ্ঞাত’-
কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং বুধবার বলেছেন, তার ভাই ও ট্রাম্পের মধ্যে যোগাযোগের খবর সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।
এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ নিয়ে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক খবর সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।’
তবে তিনি বলেন, ট্রাম্প সম্পর্কে তার ভাইয়ের এখনো ‘ভালো স্মৃতি ও অনুভূতি’ রয়েছে এবং দুই নেতার সম্পর্ক ‘চমৎকার’ রয়েছে।
তার এই বিবৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সিউল জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রস্তাবের’ পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্ষিক উলচি ফ্রিডম শিল্ড সামরিক মহড়া পরিকল্পিত সময়ের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই শেষ হবে।
পেন্টাগন বলেছে, মহড়া কমিয়ে দেওয়ায় ‘মার্কিন প্রশিক্ষণের লক্ষ্য পূরণে কোনো ঘাটতি হবে না’।
উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে এসব সামরিক মহড়া পরিচালনা করা হয়।
তবে কিম ইয়ো জং মহড়া কমানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা এটিকে মন্তব্য করার মতো বিষয় মনে করি না এবং এটি আমাদের কাছে সম্পূর্ণ আগ্রহহীন।’
পারমাণবিক অস্ত্রধর উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে এসব মহড়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। দেশটি এগুলোকে আগ্রাসনের মহড়া হিসেবে বিবেচনা করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা জোরদারে দেশটিতে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ওই যুদ্ধ শান্তিচুক্তির পরিবর্তে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল।